বিষয়টি যিনি জানেন না, ওই এলাকায় পা দিয়ে তিনি অবশ্যই হকচকিয়ে যাবেন। রাস্তার ধারে বাড়িগুলোর সামনে একের পর এক স্তূপ হয়ে আছে রকমারি টুপি। বাঁশের কঞ্চি পুঁতে এমনভাবে টুপি শুকাতে দেওয়া হয়েছে, দেখে মনে হয় টুপিগাছের সারি। টুপির চমক সামলে কোনো বাড়ির ভেতরে
ঢুকলে দেখা যাবে আরেক এলাহি কাণ্ড। পরিবারের ছোট-বড় সব সদস্য মিলে কুশিকাঁটা দিয়ে সুতার সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি করে যাচ্ছেন বাহারি সব টুপি। বাড়ির এইটুকুন ছেলে, যে এখনো নিজের কাপড়টা ঠিকমতো পরতে শেখেনি, তার হাতেও টুপি হয়ে উঠছে একটা শিল্প।
বগুড়ার ধুনট ও শেরপুর উপজেলার প্রায় সব গ্রামে রয়েছে টুপি তৈরির এই বিশাল আয়োজন। এসব টুপি একদিকে যেমন গ্রামবাসীর জীবিকার জোগান দিচ্ছে, সংসারে সচ্ছলতা আনছে, তেমনি দেশের বিভিন্ন এলাকার মুসলিম পরিবারের পুরুষ সদস্যদের টুপির প্রয়োজন মেটাচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উত্সবের সময় টুপির চাহিদা বেড়ে যায়, সরগরম হয়ে ওঠে টুপির বাজার। তখন বগুড়ার টুপিপল্লীগুলোতেও পড়ে কাজের ধুম।
যেভাবে শুরু: এক দশক আগের কথা। ধুনটের কয়েকজন ফিরলেন ঢাকা থেকে। বাড়ির নারীদের হাতে তাঁরা তুলে দিলেন সঙ্গে আনা উপহার। কুশিকাঁটা ও সুতা। কিছু টুপিও ধরিয়ে দেওয়া হলো তাঁদের হাতে। বলা হলো, ‘দেখো তো, পারো কি না এমন টুপি বানাতে।’
ওই নারীরা তখন কুশিকাঁটার কাজই জানতেন না, টুপি বানাবে কী করে? তাই বলে উত্সাহের কমতি ছিল না কারও। কুশিকাঁটার কাজ জানে এমন কারও খোঁজ করতে লাগল তারা। জানা গেল, উপজেলার সিঙ্গার বিল আদর্শ গ্রামের (আশ্রয়ণ প্রকল্প) বাসিন্দা আলেয়া কুশিকাঁটার কাজ জানেন। তাঁর কাছে গিয়ে ধরনা দিলেন তাঁরা। টুপি দেখিয়ে তাঁকে একই রকম টুপি তৈরি করতে অনুরোধ জানালেন। আলেয়া শুধু টুপি বানালেনই না, তাঁদের শিখিয়ে দিলেন কুশিকাঁটা ও সুতা দিয়ে টুপি বোনার কৌশল। সেই থেকে ধুনটের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে টুপি তৈরির কাজ। পরে তা শেরপুরেও বিস্তৃত হয়। এখন ধুনটের চালাপাড়া, মাটিকোড়া, উল্লাপাড়া, তারাকান্দি, ফকিরপাড়া, খোকশাহাটা; শেরপুরের সুঘাট, বেলগাছী, কল্যাণী, চকধলী, দশশিখাপাড়া, বথুয়াবাড়ী, মাঠপাড়া, পাঁচথুপি, চককল্যাণী, বেলগাছি, সাতারা, চকধলিসহ অর্ধশতাধিক গ্রামে শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু টুপি বোনায় নিয়োজিত।
সরেজমিনে এক দিন: সম্প্রতি ধুনটের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, বাড়ি বাড়ি বিভিন্ন বয়সী মানুষ টুপি বোনায় ব্যস্ত। সামনে ঈদ বলে এখন টুপির চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে বেড়েছে তাদের ব্যস্ততাও। কোনো বাড়ির বাইরের আঙিনায় চাটাই বা পিঁড়িতে চার-পাঁচজন গোল হয়ে বসে টুপি বুনছে। আবার কোনো বাড়ির ভেতরের উঠান বা ঘরের বারান্দায় একই দৃশ্য। একেক টুপির একেক নাম। দামেও রয়েছে ভিন্নতা।
স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানান, কদম ফুল, স্টার, বোতাম, গাছফুল, শাপলা, মনিকা, কল্যার চাক, ছাব্বিশ ফুল, মসজিদ, পঞ্চাশ ফুল, মাকড়সা, ভি, বেঁকি, পাঁচপাই ও টিক্কা টুপির চাহিদাই বেশি। এর মধ্যে কাটতি বেশি কদম, স্টার, শাপলা, টিক্কা ও গাছফুল টুপির। এসব টুপির দামও বেশি। পাইকারি ক্রেতারা এই পাঁচ রকমের টুপির প্রতিটি ১৫ থেকে ২২ টাকায় কিনে নেন। অন্য টুপিগুলো বিক্রি হয় ৯ থেকে ১২ টাকায়।
টুপির পাইকারি ক্রেতা বাচ্চু শেখ ও মাসুদ প্রামাণিক জানান, গ্রামে এসে তাঁরা ঢাকার মহাজনদের চাহিদা মাফিক টুপি তৈরির ফরমাশ দেন। টুপি তৈরি হলে তা নিয়ে ঢাকায় বিক্রি করেন। পাইকার খোরশেদ আলী জানান, এসব টুপি তাঁরা ঢাকার চকবাজারে নিয়ে মহাজনদের কাছে বিক্রি করেন।
টুপির প্রয়োজনীয় উপকরণও জোগান দেন পাইকারেরা। ঢাকা থেকে তাঁরা টুপির কারিগরদের জন্য চাহিদা মতো সুতা কিনে আনেন। পাইকারদের কাছ থেকে সুতার ববিন ৪০ টাকা বা পাঁচটি টুপির বিনিময়ে কিনে নেন কারিগরেরা। এক ববিন সুতায় ১০-১৫টি টুপি তৈরি হয়।
মাসুদ প্রামাণিক জানান, সাত বছর ধরে তিনি টুপি নিয়ে চকবাজারের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে আসছেন। ওই দোকানের মালিকের কাছে শুনেছেন, এসব টুপি পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়।
টুপি বুনে স্বাবলম্বী: টুপির কারিগরেরা প্রত্যেকেই টুপি বোনা শেখে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে। বড়রা শেখান ছোটদের। পেঁচিবাড়ী আশ্রয়ণ প্রকল্পের রুবিনা খাতুন বলেন, ‘এডে কি ইস্কুলোত শিকার জিনিস নাকি? ছোল-বউ সগলিই জানে টুপি বুনোন।’
টুপি তৈরি ও বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন চালাপাড়া গ্রামের নিলুফা। তিনি জানান, মাত্র ৪২ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রায় ১০ বছর আগে ঘরে বসে তিনি টুপি তৈরির কাজ শুরু করেন। প্রথমে তিন দিনে ১২টি টুপি তৈরি করেন তিনি। টুপি বিক্রি করে পান ১৪৪ টাকা। সেই থেকে টুপির আয়ে চলছে তাঁর সংসার।
ঢাকায় টুপি বিক্রি করে পাইকার ইব্রাহিম, খোরশেদ, বাচ্চু, মোজাম ও আজিজা তাঁদের সংসারের অবস্থা বদলে ফেলেছেন। তাঁরা কেউ জমি কিনেছেন, কেউবা তুলেছেন নতুন ঘর।
গ্রামবাসীদের ভাষ্য, তাঁদের বোনা টুপি খুব সম্ভাবনাময় একটি শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ ব্যাপারে উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর এখনো সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু সাইদ মো. সাইম খান ও উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা লায়লা আরজুমান বলেন, তাঁদের দপ্তর থেকে টুপি তৈরির কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। টুপি তৈরির কারিগরদের সহযোগিতারও কোনো ব্যবস্থা নেই।
ধুনট সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, তাঁর এলাকায় গ্রামবাসীর চেষ্টা ও শ্রমে টুপিশিল্প দিন দিন বিস্তার লাভ করছে। কিন্তু এতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই। টুপির কারিগরেরা সরকারি ঋণের সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা পেলে এ শিল্প আরও মজবুত ভিতের ওপর দাঁড়াবে।
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-23/news/5674
| পরবর্তী > |
|---|























