শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের একটি মৌজা চরজানপুর। উপজেলা সদর থেকে ট্রলারযোগে মেঘনা নদীর এই চরে পৌঁছাতে সময় লাগে তিন ঘণ্টা। সাড়ে চার শ পরিবারের তিন হাজার মানুষের বসবাস এখানে। এখানে নেই কোনো বিদ্যালয়। ফলে এখানকার শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছিল প্রাথমিক শিক্ষা থেকে। এ রকম পরিস্থিতিতে চরের শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো নিয়ে আসেন কালা মিয়া (৫৫) নামের এক দরিদ্র কৃষক। নিজ উদ্যোগে তিনি গড়ে তুলেছেন পাঠশালা। নিজে অর্ধাহারে-অনাহারে থেকেও শিশুদের কিনে দিচ্ছেন শিক্ষা উপকরণ।
দুই ছেলে, তিন মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে কালা মিয়ার সংসার। দুই বিঘা সরকারি খাস জমিতে চাষাবাদ করে কোনো রকমে সংসার চলে তাঁর। এর মধ্যে শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর কাজে নেমে যেন তিনি পড়লেন অথৈ সাগরে। নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত নেন মাছ ধরার। শিশুদের পড়ানো ও ক্ষেতের কাজ শেষে তিনি নেমে পড়েন মেঘনার পানিতে।
সেই ২০০৬ সালের কথা। ছাপরাঘর তুলে পাঠশালা চালু করেন কালা মিয়া। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের পাঠশালায় আনার চেষ্টা করেন। বর্তমানে ১৫০ থেকে ১৭৫টি শিশু নিয়মিত তাঁর পাঠশালায় আসে। একদিন ঝড়ে পড়ে যায় ঘরটি। এ পর্যায়ে এগিয়ে আসেন কুচাইপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল বাশার মুন্সী। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় করে টিনের ঘর বানিয়ে দেন তিনি।
তার পরও বর্ষায় পাঠশালা তলিয়ে যায় পানিতে, বন্ধ করে দিতে হয় পাঠদান। তবে দমে যান না কালা মিয়া। নৌকায় চড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেন শিশুদের লেখাপড়ার।
কালা মিয়া জানান, পাকিস্তান আমলে তিনি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। দারিদ্র্যের কারণে আর পড়ালেখা করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘নিজে লেখাপড়া শিখতে না পারায় সব সময় কষ্টে থাকি। চরের শিশুরা শিক্ষা-বঞ্চিত হওয়ায় খুব মায়া হয়। আমার সাধ্য অনুযায়ী চরের শিশুদের বর্ণমালা, ছড়া ও কবিতা শিখাই।’
চরের বাসিন্দা রানি বেগম (৩৫) ও সখিনা বেগম (৩২) বলেন, ‘আমরা নিজেরা লেখাপড়া শিখতে পারিনি। ঘরের কাজের ফাঁকে মাঠে কাজ করি। অভাব-অনটনের সংসার, সন্তানদের অন্যত্র লেখাপড়া শেখানোর মতো অবস্থা আমাদের নেই। কালা মিয়া আমাদের সন্তানদের ডেকে নিয়ে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন।’
এই চরে ২০ বছর ধরে বাস করছেন মতি ব্যাপারি (৪৫)। তিনি বলেন, ‘কালা মিয়া শিশুদের পড়ালেখা শেখানোর কথা বললে প্রথমে আমরা আমলে নিতাম না। এখন কালা মিয়াই আমাদের ভরসা। আমরা তাঁকে কোনো টাকা-পয়সা দিতে পারি না। নিজের উদ্যোগেই তিনি চরের শিশুদের বই-খাতা কিনে দেন।’
কালা মিয়ার পাঠশালার শিক্ষার্থী কাদির (৮), ইসমাইল (৭), রিক্তা (১০), সুমনা (৮) ও রিয়াদ (৮) বলে, ‘আমরা কালা মিয়া চাচার কাছে বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালা, ছড়া ও কবিতা শিখছি। এখন স্কুলে পানি উঠে যাওয়ায় সেখানে যাই না। চাচা মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে এসে খোঁজখবর নেন। আমরা লেখাপড়া শিখতে চাই। এখানে একটা বিদ্যালয় চাই।’
স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নড়িয়া উন্নয়ন সমিতির (নুসা) নির্বাহী পরিচালক মাজেদা শওকত আলী বলেন, শিশুদের বিদ্যালয়ে যেতে উত্সাহিত করা, শিশুর শিক্ষার ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন করা প্রভৃতি বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো কাজ করে। কিন্তু চরে শিশুদের জন্য যে কোনো বিদ্যালয়ই নেই, সেটা কেউ খেয়াল করে না। চরজানপুরে সরকারিভাবে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করা জরুরি।
কুচাইপট্টি ইউপি চেয়ারম্যান আবুল বাশার মুন্সী বলেন, ‘চরজানপুরে কালা মিয়া একটি প্রশংসনীয় কাজ করছেন। চরের মানুষকে শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। আমাদের উচিত এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁকে সহায়তা করা। এখানে বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য আমি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি।’
স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসডিএসের নির্বাহী পরিচালক মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা চরাঞ্চল নিয়ে কাজ করি। পাশের দুটি চরে সংস্থার পক্ষ থেকে বিদ্যালয় স্থাপন করে দিয়েছি। চরজানপুরেও বিদ্যালয় স্থাপন করার পরিকল্পনা করছি।’
কালা মিয়া বলেন, ‘আমার অভাবের সংসার। পরিবারের সদস্যদের খাবার জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। চরের শত শত অবহেলিত শিশুর কথা চিন্তা করে একটু বেশি পরিশ্রম করি। সেই অর্থ দিয়ে পাঠশালাটি চালাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, এই চরের মানুষের লেখাপড়া শেখার অনেক আগ্রহ। কিন্তু তারা সুযোগ পাচ্ছে না। সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে একটি বিদ্যালয় নির্মাণ করা হলে চরজানপুরের মানুষের স্বপ্ন পূরণ হবে।
গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুর্গম চর হওয়ায় সেখানে সরকারিভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। বেসরকারি কোনো সংস্থাকে ওই চরে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।
কালা মিয়ার উদ্যোগ প্রশংসনীয় উল্লেখ করে ইউএনও বলেন, ‘তাঁকে এগিয়ে যেতে আমরা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে আরও সহায়তা করব।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রওশন আলী বলেন, স্থানীয়ভাবে কেউ আবেদন করলে সেখানে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (রেজিস্টার্ড) স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের শিক্ষা বরাদ্দ থেকে বিদ্যালয়ের ঘর তুলতে হবে।
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-23/news/5671
| পরবর্তী > |
|---|























