দেশের উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা-কবলিত জেলাগুলোর সবুজ মাঠে এখন সোনা-রঙের বাড়ন্ত ধানের ছড়াছড়ি। বছরের পর বছর এ মরা কার্তিকে যেখানে কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে কৃষকদের লড়াই করতে হয় মঙ্গার সঙ্গে, এবার সেই সময়ই কৃষকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আগাম আমন ধান কাটার উৎসবে। দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বিনা-৭ নামের স্বল্প সময়ে ফলনের এক ধরনের ধান চাষ করে কৃষকদের এ সফলতা এসেছে।
কৃষি গবেষকদের হিসাবে বিনা-৭ ধান ১১৫ দিনে ঘরে ওঠার কথা থাকলেও কৃষকদের বাড়তি আদর-সোহাগে মাত্র ১০০ দিনেই এ ধান তাদের ঘরে উঠেছে। রংপুর, কৃড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও পঞ্চগড়ে মঙ্গার ধান বলে পরিচিত হয়ে উঠেছে এ ধান। কৃষিবিজ্ঞানীদের আশা, উত্তরাঞ্চলে বিনা-৭ ধান চাষ করে মঙ্গাকে চিরতরে হার মানানো যাবে। এলাকার কৃষকরাও পণ করেছেন, এ ধান চাষ করেই তারা মরা কর্তিককে ভরা কার্তিকে পরিণত করবেন।
বছরের পর বছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে নতুন ফসল না ওঠায় বৃহত্তর রংপুরে দিনমজুর শ্রেনীর মানুষের হতে কোন কাজ থাকে না। এটি টানা ১০০ বছরের চিত্র। আয় না থাকায় খাবারও থাকে না অনেক ক্ষুদ্র, প্রান্তিক কিংবা মাঝরি মানের চাষীর ঘরে। কাজের অভাবে এ অঞ্চলে দেখা দেয় তখন মঙ্গা। মঙ্গা একটি আঞ্চলিক শব্দ। প্রতিবছর এ সময়ে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারীসহ উত্তরবঙ্গের বেশকিছু এলাকায় লাখ লাখ মানুষ এ মঙ্গাকবলিত হয়ে পড়েন। একটু কাজ আর এক মুঠো খাবারের সন্ধানে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ বাসের ছাদে করে শহরের দিকে ছুটে চলে।
আগাম শ্রম দিয়েও আনেকে এক বেলা পেটের ভাত জোগাড় করতে পারেন না। এ সময়টায় উত্তরবঙ্গের অনেক অভাবী মানুষকে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হয়। আর এভাবেই বছরের পর বছর মঙ্গার সময়টা পার করছেন এ অঞ্চলের লাখ লাখ অভাবী মানুষ। প্রতিবছর এভাবে মঙ্গাকবলিত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে। সরকার ও এনজিওগুলো স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নিয়ে মঙ্গা মোকাবেলায় বারবার ব্যর্থ হয়েছে। সবাই একটি স্বায়ী সমাধান আশা করছিল। কিন্তু কোন আশার আলো দেখা যায়নি এতোদিন। তবে এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখেন দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা। তারা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য মঙ্গা থেকে স্বায়ীভাবে পরিত্রাণের পথ খুঁজে পেয়েছেন। মঙ্গার সময়টায় কৃষকরা এখন ধান ঘরে তুলতে পারবেন। আর ব্যপকভাবে এ ধান চাষের মাধ্যমে মঙ্গাকবলিত মানুষেকে রক্ষা করা সম্ভব।
বাংলাদেশের আর দশটি গ্রামের মতোই দেখতে সুন্দর জয়রামপুর। রংপুর-বগুড়া মহাসড়ক ধরে কিছুটা এগিয়ে বামে মোড় নিয়ে পাকা সরু রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোলে চোখে পড়ে কাঁচা মাটির আঁকাবাঁকা গ্রাম্য মেঠোপথ। পায়ে হাঁটার মিনিট দশেকের পথটি মিশেছে জয়রামপুর গ্রামের ভেতরে। গ্রামের যে দিকে চোখ যায়, দেখা যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। কৃষক বুনেছে নানা জাতের শীতের শাকসবজি। ফুটেছে সাদা তুলা গাছে হলদে সরষের ফুল। গ্রামের কিছু অংশে কোথাও পাকা আবার কোথাও আধাপাকা ধানও এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঠের দিকে তাকালে চোখে পড়ে কৃষকদের দারুণ ব্যস্ততা। ধান কেটে বিছিয়ে রাখা হয়েছে ক্ষেতে, পাশেই আধুনিক কৃষিযন্ত্র ধান মাড়াই কলে সোঁ সোঁ শব্দে চলছে ধান মাড়াইয়ের কাজ। গ্রামের কৃষক বধূরা সদ্য মাড়াই করা নতুন ধান ঘরে ওঠানোর কাজে ব্যস্ত। কল্পনা নয়, সত্যিই বিকালের সোনারাঙা রোদ পড়েছে গ্রামের মাঠে। ছোট ছোট বাড়ন্ত ছেলেমেয়েরা ব্যস্ত গোলাছুট আর বৌচি খেলায়। ওপারর এ চিত্রটি একটি আদর্শ গ্রামের চিত্র বলে মনে হলেও কয়েক বছর আগে এ বাস্তব চিত্রটি ছিল কল্পনার জগতে।
রংপুর সদরের ডিমলার কৃষক এন্তাজ মিয়া চলতি বছর দুই হেক্টর জমিতে বিনা-৭ ধানের চাষ করেছেন। ১৬ দিন বয়সী চারা রোপণ করেন তিনি। মাত্র ১০০ দিনেই তার ধান পেকেছে। হেক্টরে তার ফলন হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত টন, যা বিঘাতে প্রায় ১৮ মণ হয়েছে। যেখানে আমনের অন্য জাত বিআর-১১ বিঘাপ্রতি উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৮ থেকে ৯ মণ। ডিমলা বড় রংপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান জানান, বিনা-৭ রোপণের পর হঠাৎ বৃষ্টিতে তার জমি তলিয়ে যায়। টানা ১০ দিন পানির নিচে থাকে। তারপরও তার ফলন হয়েছে ভালো।
বিনা-৭ ধান উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলী আজম। তিনি ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত গবেষণা করে এ জাত আবিষ্কার করেন। এ ধান সম্পর্কে ড. আলী আজম বলেন, বিনা-৭ ধান একটি মিউট্যান্ট লাইন। এ ধানের মাতৃজাতের নাম তাইওয়ান নেগুয়েন। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনের একটি প্রকল্পের আওতায় মাতৃজাত তাইওয়ান নেগুয়েনের এ লাইনটির মিশ্রিত বংশধরা। ভিয়েতনাম থেকে এ ধান সংগ্রহ করা হয়। পরে পরীক্ষণের মাধ্যমে এ মিউট্যান্ট লাইনটিকে শুদ্ধ করা হয়। পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমন মৌসুমে ফলন পরীক্ষায় ফল সন্তোষজনক হওয়ায় এ মিউট্যান্টকে চুরান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। গত কয়েক বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে এ ধানের চাষ করে সফলতা পাওয়া যায়। ২০০৭ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড এ জাতটির অনুমোদন দেয়।
দেশের প্রায় সব রোপা আমন অঞ্চল, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলসহ মাগুরা, কুষ্টিয়া, যশোর, ঢাকা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহে এ ধানের ভালো ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন উদ্ভাবক ড. আলী আজম। বিনা-৭ প্রচলিত জাত ব্রি-৩০ ও ব্রি-৩২ ধান অপেক্ষা কিছুটা খাটো এবং প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন আগে পাকে। ধান ও চাল ব্রি-৩০ এর মতো কিন্তু ব্রি-৩২ ধানের তুলনায় লম্বা ও চিকন। আগাম পকালেও এটি বি-৩০ ও ব্রি-৩২ ধানের তুলনায় ফলন বেশি দেয়। যেসব অঞ্চলে রবিশস্য, গম বা আলু আবাদ করা হয় সেসব অঞ্চলের জন্য এ জাতটি খুবই উপযোগী। এ ধানের চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী রোপা আমন জাতের মতোই। বীজতলায় চারা করার পর লাইন করে চারা রোপণ করতে হয়। রোপণের জন্য চারার বয়স ২৫ থেকে ২৭ দিন হলেই চলে। জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বীজতলা করলে খুব সহজেই পরবর্তী শস্য, বিশেষ করে রবি, গম বা আলু জাতীয় শস্যের চাষ করা যায়। এ জাতটির পাতাপোড়া, খোলপচা ইত্যাদি রোগের আক্রমণ মোটামুটি ভালোভাবে প্রতিরোধ করতে পারে। এছাড়া এটি প্রায় সব ধরনের পোকার আক্রমণ মোটামুটি ভালোভাবে প্রতিরোধ করতে পারে। ড. আলী আজম বলেন, মাত্র ১১৫ দিনেই নতুন এ ধান ঘরে তোলা যাবে। অথচ অন্য জাতের আমন ধান পাকতে সময় লাগে ১৫০ দিনের বেশি। এ ধান কাটার পর কৃষকরা আমন মৌসুমেই পতিত জমিতে গম ও আলুসহ রবিশস্যের আবাদ করতে পারবেন। ফলে বিনা-৭ ধান চাষ করে কৃষকরা একই মৌসুমে দুটি ফসল ফলাতে পারবেন। আগাম জাতের এ ধান কেটে কৃষকরা জমিতে আলু, গম ও শীতকালীন শাকসবজির চাষ করবেন। এছাড়াও বন্যা, খরা, পোকা ও মঙ্গা মোকাবেলায় এ ধান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
বিনার প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান ড. এম রইসুল হায়দার জানান, এ বছর সারাদেশে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বিনা-৭ জাতের ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর অঞ্চলে চাষ হষেছে প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমিতে। রাংপুরে এ বছর আমন চাষের টার্গেট ছিল ১ লাখ ৫২ হাজার ১০০ হেক্টর। আর বাস্তবায়ন হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর বেশি।
আধুনিক কৃষি পদ্ধতি বদলে দিয়েছে দেশের প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থা। ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগেও গ্রীষ্ম-বর্ষা মৌসুমে আমন ও আউশই ছিল প্রধান ফসল। বোরো ছিল তৃতীয় স্থানে। আবহাওয়া ও পরিবেশের দিকে লক্ষ্য রেখে উচ্চ ফলনশীল বোরো সাম্প্রতিককালে উঠে এসেছে প্রধান ফসল হিসেবে। আমন ও আউশ যাচ্ছে বিলুপ্তির পথে। অব্যাহত জনস্ফীতি, শিল্পায়ন ও নতুন বসতি স্থাপনে চাষের জমি ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষ অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
কৃষিবিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, দেশের প্রায় ১৫ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ সম্ভব কেবল উচ্চফলনশীল এসব ধানের বদৌলতে, যা ২০২০ সালের মধ্যে এ উৎপাদন দিগুণ করতে হবে। না হলে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে। বাংলাদেশে বছরে লোকসংখ্যা বাড়ে প্রায় ২০ লাখ। মানুষ বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বছরে পর বছর খাদ্য চাহিদাও বাড়ে। অন্যদিকে দেশে প্রতিদিন গড়ে ২২০ হেক্টর কৃষিজমি ধ্বংস হয়ে জাচ্ছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে দিন দিন এ পরিমাণ জমি কমতে থাকলে ২০২০ সালের মধ্যে সারাদেশের মোট কৃষিজমির এক-চতুর্থাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে লবণক্ততার ফলে গড়ে প্রতিদিন ২০ শতাংশ করে জমি নষ্ট হচ্ছে। আর তাই দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা নতুন নতুন ফসল উদ্ভাবন করে এ সঙ্কট উত্তরণের চেষ্টা করছেন।
Ref. URL: http://www.jaijaidin.com/details.php?nid=156840
| < পূববর্তী |
|---|























