দেশের সিমেন্ট খাত নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। মাঝখানের মন্দাবস্থা কাটিয়ে উত্পাদনে গতিশীলতা এসেছে। প্রসারিত হয়েছে রপ্তানি বাজার। আবার সরকার বড় বড় কিছু অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় দেশীয় সিমেন্টের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। আর এসব কিছুকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুসারে, বিগত দুই দশকে দেশে ছোট-বড় প্রায় ৭০টি সিমেন্ট কারখানা গড়ে ওঠে। মোট উত্পাদনক্ষমতা দাঁড়ায় দুই কোটি টন। কিন্তু বাজার না পেয়ে বিগত কয়েক বছরে এই উত্পাদনক্ষমতার অর্ধেক অব্যবহূত হয়ে পড়েছিল। বন্ধ হয়ে গেছে ৩৫টি কারখানা।
তবে ২০০৯ সালটি আবার নতুন করে আশার আলো দেখাতে শুরু করেছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট নির্মাতা বড় বড় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফলও ভালো। এটাও সিমেন্ট খাতের গতিময়তার আভাস দিচ্ছে।
গোড়ার কথা: নব্বইয়ের দশকের আগে বাংলাদেশে সিমেন্টের চাহিদার সিংহভাগই পূরণ হতো বিদেশ থেকে আমদানি করে। স্থানীয় উত্পাদন বলতে মূলত সরকারি খাতে সুনামগঞ্জের ছাতক সিমেন্ট কারখানা। ১৯৪১ সাল থেকে এখানে সিমেন্ট উত্পাদিত হচ্ছে।
এই পুরোনো সিমেন্ট কারখানার বাইরে স্বাধীনতার পর প্রথম বেসরকারি খাতে সিমেন্ট কারখানা গড়ে ওঠে ১৯৯২ সালে। মাত্র পাঁচ বছরে আরও আটটি কারখানা গড়ে ওঠে বার্ষিক প্রায় ৩২ লাখ টন উত্পাদনক্ষমতা নিয়ে।
তবে নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে নির্মাণ খাতের বড় প্রবৃদ্ধি দেখে একসময়ের সিমেন্ট আমদানিকারকেরা সবাই বিদেশ থেকে ক্লিংকার এনে দেশে সিমেন্ট তৈরির কারখানা নির্মাণের হুজুগে মেতে ওঠে। এর ফলে একপর্যায়ে বাজার চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি উত্পাদনক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়।
তীব্র প্রতিযোগিতা ও বড় বড় অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগের নিম্ন গতিতে বাজার না পেয়ে অনেক কোম্পানিই মুখ থুবড়ে পড়ে।
হালচিত্র: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত তিনটি বড় সিমেন্ট উত্পাদন কোম্পানি হাইডেলবার্গ, লাফার্জ সুরমা ও মেঘনা সিমেন্ট—সবারই অর্ধবার্ষিক (জানুয়ারি-জুন ২০০৯) ফলাফল ইতিবাচক। তাদের মধ্যে লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট উত্পাদনের পাশাপাশি ক্লিংকার উত্পাদন করে থাকে।
হাইডেলবার্গ সিমেন্টের বার্ষিক উত্পাদনক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ টন। তারা রুবি ও স্ক্যান নামের দুটি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট বাজারজাত করে। কোম্পানির দাবি অনুযায়ী মোট বাজারের প্রায় ১৩ শতাংশ তাদের দখলে।
ডিএসই বলছে, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট ২০০৯ সালের প্রথম ছয় মাসে তাদের দুটি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট বিক্রি থেকে আয় করেছে প্রায় ৪১০ কোটি টাকা। গত বছর একই সময় প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৩৪৫ কোটি টাকা।
বিশ্বের অন্যতম সিমেন্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানি লাফার্জের বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান লাফার্জ সুরমারও এ বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের ব্র্যান্ড সুপারক্রিট ও ক্লিংকার বিক্রি থেকে আয় বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে তাদের মোট আয় হয়েছে ৩৮০ কোটি টাকা। গত বছর একই সময় প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ২৯৭ কোটি টাকা। অর্থাত্ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৭ শতাংশ।
প্রায় ১০ লাখ টন উত্পাদনক্ষমতার মেঘনা সিমেন্ট কিং ব্র্যান্ডের সিমেন্ট বাজারজাত করে থাকে। ডিএসই তথ্য অনুসারে ২০০৯ সালের প্রথম ছয় মাসে তাদের সিমেন্ট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ২৩৯ কোটি টাকা। গত বছর একই সময় তাদের আয় ছিল ১৭৬ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিগত দুই বছরের তুলনায় এ বছর পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। তবে এখনো উত্পাদনক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহূত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে গেছে।’
মোস্তফা কামাল এ খাতের দুটি আশার খবর জানালেন। উত্পাদকেরা নিজেরাই ভারতসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানির বাজার তৈরি করে ফেলেছে। ভারতেই এখন প্রতিমাসে অন্তত ১২ হাজার টন সিমেন্ট রপ্তানি হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারের হাতে বেশ কিছু বড় প্রকল্প আছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রাস্তা চার লাইন করা, পদ্মা সেতু নির্মাণ, ঢাকা শহরে একাধিক ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো বড় বড় অবকাঠামোর কাজ যদি আগামী বছর শুরু হয়, তাহলে সিমেন্ট খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যাবে।
রপ্তানি চিত্র: রপ্তানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার টন সিমেন্ট ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি করছে হোলসিম বাংলাদেশ, শাহ সিমেন্ট, মেঘনা সিমেন্ট, মদিনা সিমেন্ট, আরামিট সিমেন্ট, এমআই সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্টসহ প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠান।
তাদের মধ্যে হোলসিম বাংলাদেশ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে শক্ত জায়গা করে নিয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানি হোলসিমের বার্ষিক উত্পাদনক্ষমতা ১৩ লাখ টন।
কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ২০০০ সাল থেকে কোম্পানিটি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। জাতীয়ভাবে মোট বাজারের আট শতাংশ তাদের দখলে। তবে ঢাকার বাজারের ১৭ শতাংশ হোলসিম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সালে ৩২ হাজার টন সিমেন্ট ভারতে রপ্তানি করেছে। আর বর্তমানে প্রতি মাসে এ প্রতিষ্ঠান আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টন সিমেন্ট ভারতে রপ্তানি করছে।
দেশের অন্যতম রড়-সিমেন্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানি আবুল খায়ের গ্রুপের শাহ সিমেন্টও রপ্তানি বাড়াচ্ছে। কভার্ডভ্যানে ঘরে ঘরে সিমেন্ট পৌঁছে দিয়ে বাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল শাহ সিমেন্ট। বার্ষিক ছয় লাখ টন উত্পাদনক্ষমতার দুটি ইউনিট স্থাপন করে এক দশক আগে কোম্পানিটির যাত্রা শুরু।
জানা গেছে, ক্রাউন ব্র্যান্ডের বাজারজাতকারী এম আই সিমেন্টের হাতে বর্তমানে বড় বড় রপ্তানি আদেশ আছে। ত্রিপুরা থেকে এ বছর তারা ১২ হাজার টন রপ্তানির আদেশ পেয়েছে।
রেকর্ড উত্পাদন: সিমেন্ট প্রস্তুতকারকদের সূত্রে জানা গেছে, অনেক বছর পর আবার ২০০৯ সালে একটি রেকর্ড হতে পারে। বাংলাদেশে সিমেন্ট খাতের ইতিহাসে মাত্র একবার ২০০৬ সালে এক কোটি টনের ওপরে সিমেন্ট উত্পাদন হয়ে ছিল। উত্পাদকদের আশা, রপ্তানির বাজার যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে যদি সরকারের বড় বড় নির্মাণকাজ শুরু হয়, তাহলে এ বছর উত্পাদন এক কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে। আর অল্প সময়ের মধ্যেই উত্পাদনক্ষমতার পুরোটাই ব্যবহার শুরু হবে দেশে।
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-10-28/news/15368
| < Prev | Next > |
|---|























