Developmentbd.com

  • Increase font size
  • Default font size
  • Decrease font size
Home >> Cloth and Industry >> Steps Should Be Taken >> উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চল : সমৃদ্ধির অপার সম্ভাবনা

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চল : সমৃদ্ধির অপার সম্ভাবনা

E-mail Print PDF

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তব্যাপী ঋজু দৃঢ়তায় দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ গারো খাসিয়া জৈন্তা পাহাড় শ্রেণী। এ পাহাড় শ্রেণী ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যের দক্ষিণে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তব্যাপী বিস্তৃত। ভূতাত্ত্বিকভাবে এ পাহাড়গুলো আনুমানিক ৫ কোটি বছরের পুরনো। উচ্চতা ৪-৭ হাজার ফুট। বাংলাদেশ অংশে এ পাহাড় শ্রেণী পূর্ব-পশ্চিমে সোজাসুজি Aerial Distance অনুমান ২৬০ কিলোমিটার।

মেঘালয়ের রাজধানী শিলং এবং আসামের রাজধানী গৌহাটি বাংলাদেশ সীমান্তের মোটামুটি নিকটবর্তী। জানা যায় এ পাহাড় শ্রেণী উত্তর-দক্ষিণে ৫০-৭০ কিলোমিটার চওড়া। বলতে গেলে মেঘালয় রাজ্য পুরোটাই পাহাড়। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও বৃহত্তর সিলেটসহ মেঘালয় আসামের এ পুরো অঞ্চল পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত অঞ্চল। পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত-সম্পন্ন স্থান চেরাপুঞ্জি সিলেট সীমান্তের অতি সন্নিকটে। সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত অঞ্চল বিধায় এ সকল পাহাড়ে ঘন বনরাজি বিদ্যমান।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ্‌ হতে এ অঞ্চল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বলতে গেলে পুরো পাহাড় শ্রেণীই চুনাপাথরে মুড়ানো। তাছাড়া, কয়লা, গ্যাস, তেলসহ বহু খনিজ সম্পদ এ অঞ্চলে বিদ্যমান। গারো পাহাড়ের বাংলাদেশ অংশে সাদামাটি চীনামাটির সামগ্রী উৎপাদনের প্রধান উৎস। এ এলাকার অতি উন্নতমানের সিলিকা বালি বিশ্বমানের কাঁচ তৈরির জন্য উপযোগী। তাছাড়া, এ এলাকার নুড়ি পাথর ও বোল্ডার দেশে গুণে-মানে সর্বোচ্চ। প্রতি বছর এ পাহাড় শ্রেণী হতে লাখ লাখ টন বোল্ডার, নুড়ি পাথর ও সিলিকা বালু বাংলাদেশে নেমে আসছে। তা’ছাড়া, এ পাহাড় সংলগ্ন বাংলাদেশ অংশে মাটির নীচে বিপুল পরিমাণ চুনাপাথর রয়েছে। বাংলাদেশ অংশেও সাদামাটি, বোল্ডার, নুড়ি পাথর ও সিলিকা বালির অফুরন্ত ভাণ্ডার। এ অঞ্চলে শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কয়লাও অত্যন্ত সুলভ। বাংলাদেশ অংশে কয়লা উত্তোলন করা না হলেও ভারত অংশের অনেক খনি হতে কয়লা উত্তোলিত হচ্ছে। বর্তমানে সীমান্তের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে কয়লা আমদানী করা হয়। উল্লেখ্য, এ পাহাড় শ্রেণীর কয়লাখনি হতে উত্তোলিত কয়লার বাংলাদেশই একমাত্র বাজার। পুরো গারো, খাসিয়া ও জৈন্তা পাহাড়শ্রেণীর গাঁ ঘেঁষে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। রেডক্লিপ বাউন্ডারী কমিশন প্রতিটি সুউচ্চ পাহাড়কে ভারতের অংশ ধরে সীমান্ত রচনা করে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ অংশে উঁচু পাহাড় নেই বললেও অত্যুক্তি হবে না। এ কারণে পাহাড়ের সম্পদের সিংহভাগই ভারতের। তবে সীমান্ত এলাকায় কিছু টিলা ২০০-৫০০ ফুট উচ্চতায় বাংলাদেশ অংশে রয়েছে। সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে জৈন্তাপুরের পাশে লালাখাল পাহাড়ের উচ্চতা সবচেয়ে বেশি।

কুড়িগ্রাম জেলার রাজীবপুর উপজেলায় এ পাহাড় শ্রেণী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করেছে এবং সীমান্ত ধরে পূর্ব অভিমুখে প্রসারিত হয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা অতিক্রম করে বৃহত্তর সিলেটের কানাইঘাটের বড়চাতল ইউনিয়নের পর সীমান্ত হতে আসামের অভ্যন্তরে ঢুকে গেছে। গারো খাসিয়া জৈন্তা পাহাড় শ্রেণী হতে বেশকিছু নদী উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে পতিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ভোগাই (শেরপুর), সুমেশ্বরী (নেত্রকোনা), যাদুকাটা, ঝালকালি ধামালিয়া, নোয়াগাং, উমিয়াম (সুনামগঞ্জ), পিয়াইন, সারী, গোয়াইন, ঢাউকী, লালাখাল, লোভাছড়া (সিলেট) অন্যতম। কুড়িগ্রামের রাজীবপুর হতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর, কলমাকান্দার সুমেশ্বরী নদী পর্যন্ত এ পাহাড় শ্রেণীর অংশকে গারো, তৎপরবর্তী পিয়াইন নদী পর্যন্ত অংশকে খাসিয়া এবং পরবর্তী অংশ জৈন্তা পাহাড় নামে খ্যাত। মোটামুটি গারো ও জৈন্তা পাহাড় সংলগ্ন ভূমি একই সমতলে মূল ভূমির সাথে একীভূত হয়ে আছে। কিন্তু খাসিয়া পাহাড় সংলগ্ন ভূমি হতে দক্ষিণ দিকে সুনামগঞ্জের হাওর (নিচু ভূমি) এলাকা বিস্তৃত। হাওর ও পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গা কোন কোন এলাকায় ২-৩ কিলোমিটার আবার কোন কোন এলাকায় ৭-৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। কুড়িগ্রাম জেলার রাজীবপুর উপজেলা হতে পাহাড় শ্রেণী বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত ধরে যথাক্রমে জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলা অবধি প্রসারিত হয়েছে। দুর্গমতার কারণে এ জেলাসমূহের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোর তেমন কোন উন্নয়ন ঘটেনি। একমাত্র বোরো ফসলের উপর নির্ভরশীল পুরো জনপদ। অকাল বন্যায় প্রায়শ প্লাবিত হয়ে পুরো ফসল বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে সাধারণ জনগণ চরম দারিদ্র্যতায় পতিত হয়। দুর্গমতার কারণে সাধারণ মানুষ কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত থেকে অনেকটা মানবেতর জীবন যাপন করছে।

১। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে নব প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান সরকার গারো খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের সীমান্ত ঘেঁষে সম্ভবত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করেই একটি সড়ক নির্মাণ শুরু করে। পুরো পাহাড় শ্রেণী বরাবর সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল কি না তা জানা না গেলেও কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজীবপুর হতে পূর্ব দিকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ হয়ে সুনামগঞ্জের ছাতক পর্যন্ত এ সড়ক নির্মিত ছিল বলে জানা যায়। তবে নির্মিত সড়ক ছিল কাঁচা, পাকা করা হয়নি। স্থানীয় জনগণের কাছে এ রাস্তা এখনও বর্ডার রোড (Border Road) নামে অভিহিত। বর্তমানেও এ সড়ক সীমান্তবাসীদের চলার একমাত্র পথ। তবে নির্মাণের পর জানা মতে অদ্যবধি এ সড়কে রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামতের কোন কাজ করা হয়নি, পাকা করা বা কোন ব্রীজ কালভার্ট নির্মাণের কাজও হয়নি। তবে কোন কোন জেলায় (যেমন, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর ও ময়মনিসংহে) সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ কর্তৃক স্ব স্ব উদ্যোগে আলাদা আলাদাভাবে এবং পরস্পর সমন্বয়বিহীনভাবে বিভিন্ন সময়ে এ সড়কের কোন কোন অংশে মেরামত ও পাকার কাজ করা হয়েছে। ফলে এ সড়কের কোন অংশ পাকা আবার কোন অংশ কাঁচা রাস্তায় পরিণত হয়েছে। তবে কুড়িগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ অংশে এ ধরনের কোথাও মেরামত ও পাকা কাজ থাকলেও নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ এ দুটো জেলার কোন অংশেই কোন কাজ করা হয়নি। সিলেট জেলার কোন কোন উপজেলা অংশে কিছু কাজ হয়েছে। আবার এ সড়কের মাঝে কতিপয় নদীতে ব্রিজ, কালভার্টও ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কিছু নির্মাণাধীন আছে। কোম্পানিগঞ্জের সাথে সিলেট শহরের উন্নতমানের সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হওয়ায় আলোচ্য সড়কের সাথে সিলেট শহরের সরাসরি যোগাযোগও স্থাপিত হয়েছে। গারো খাসিয়া জৈন্তা পাহাড় শ্রেণীর পুরো সীমান্ত এলাকা সংযোগ করতে হলে গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটের সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত এ সড়ক সম্প্রসারণ করতে হবে।

ক) এ মহাসড়ক বৃহত্তর সিলেট, বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং বৃহত্তর রংপুর ও বৃহত্তর দিনাজপুরের (এক কথায় বৃহত্তর সিলেটে ময়মনসিংহের ও পুরো উত্তরবঙ্গের) মধ্যে যাত্রী এবং কৃষি, শিল্প কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ মহসড়কের সাথে স্থানে স্থানে লিংক রোড স্থাপনের মাধ্যমে ঢাকাগামী রাস্তার সাথে সংযোগ সাধন করা যাবে। ফলে রাজধানী ঢাকাতেও যাত্রী ও মালামাল পরিবহন সুবিধার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে উত্তরবঙ্গ ও ঢাকার সাথে পূর্বাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। বিশাল হাওর অঞ্চলের অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের আকাঙক্ষা সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা সংযোগ রাস্তা যা হাওরের উপর দিয়ে নির্মাণ দুষ্কর বলে বিবেচিত হচ্ছে তার একটি যথাযথ বিকল্প তৈরি হবে।

খ) যাতায়াত ব্যবস্থা সুগম হওয়ায় শ্রমিক চলাচল সহজ হবে, শ্রমপ্রবাহ বাড়বে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মঙ্গাপীড়িত লোকজন ও দারিদ্র্যপীড়িত হাওড়বাসীর বেকারত্ব লাঘবের সুযোগ সৃষ্টি হবে, পাশাপাশি সিলেটে ময়মনসিংহের শ্রম প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে এলাকায় শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

গ) এ মহাসড়কটি নেত্রকানা ও সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা ধরে প্রসারিত বিধায় এ রাস্তা Flood Protection Dam হিসেবেও কাজ করবে। এতে সিলেট সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিশাল হাওর অঞ্চলের বিপুল ফসলী জমি অকাল বন্যার কবল হতে রক্ষা পাবে। হাওর অঞ্চলে সাধারণত প্রতি তিন বছরে কম করে হলেও একবার অকাল বন্যায় ফসলি জমি পানিতে ডুবে যায়। এজন্য হাওর অঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য তাদের পিছু ছাড়ে না। আর দেশও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের উপর অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ী ঢলের (Splash Flood) প্রবাহ এদিক সেদিক অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছুটার কারণে অকাল বন্যার সৃষ্টি হয় এবং ফসল রক্ষাকারী বাঁধসমূহ ভেঙ্গে যায়। এ মহাসড়ক নির্মাণ করা হলে পাহাড়ি ঢলের পানি নিয়ন্ত্রিত পন্থায় পরিকল্পিত মতে দেশের নিম্নঞ্চলে প্রবাহিত করা সম্ভব হবে। এতে ফসলি জমি রক্ষা পাবে এবং হাওর এলাকার বিপুল পরিমাণ ধান দেশের খাদ্য সমস্যা মিটাতে সহায়ক হবে। তবে পাহাড়ি ঢলে এ সড়কও মাঝে মাঝে ভাঙ্গতে পারে- এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সড়কের Enforcement বৃদ্ধি করতে হবে এবং পানির outlet রাখার জন্য স্থানে স্থানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কালভার্ট, ব্রীজ নির্মাণ করতে হবে।

বিশাল হাওড় অঞ্চল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ মৎস্য উৎপাদন ক্ষেত্র। আলোচ্য এ সড়কের পাশেই রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, করচার হাওরসহ দেশের ছোট-বড় অসংখ্য হাওর। এ সমস্ত হাওরে নির্বিচারে পোনা মাছ ধরা হয় এমনকি শীতকালে যখন হাওরের পানি বিলে সঞ্চিত হয়ে মাছের ভাণ্ডারে পরিণত হয় তখন জলমহাল ব্যবসায়ীগণ এগুলো হতে কেবল জাল দ্বারাই মাছ ধরে ক্ষান্ত হয় না- ইঞ্জিন পাম্প দ্বারা বিল শুকিয়ে পোনাসহ সকল মাছ ধরে মাছের নির্বংশ সাধন করে। হাওরগুলোর এ ধরনের অবৈধ মাছ আহরণ ও মৎস্য সম্পদ বিনষ্টের হাত হতে বাঁচাতে পারলে সারা দেশের মাছের চাহিদা কেবল হাওর অঞ্চল হতে মিটানো সম্ভব এমনকি বিদেশে রপ্তানিও সম্ভব। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্গমতার কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষে অবৈধ মৎস্য শিকার রোধ সম্ভব হয় না। এ মহাসড়ক নির্মিত হলে দিবারাত্রি তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে এ বিশাল মৎস্য সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে। তাছাড়া আধুনিক পদ্ধতিতে মাছের পরিচর্যাও করা যাবে। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড় ও পাহাড় সংলগ্ন এলাকা উত্তমমানের কমলালেবুর জন্য জগদ্বিখ্যাত। বাংলাদেশ অংশে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ ভাগের পূর্বে বিশাল বিশাল কমলালেবুর বাগান ছিল। স্থানীয় খাসিয়া জনগোষ্ঠী এগুলো আবাদ করত। ঐ এলাকার জমির ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) রেকর্ডে বড় বড় প্লটসমূহ খাসিয়াদের মালিকানাধীন কমলালেবুর বাগান হিসেবে রেকর্ড রয়েছে। কিন্তু অবাক বিষয় হল- পাকিস্তান আমলের মাঝামাঝি সময়েই এ সমস্ত কমলালেবুর বাগান নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সরকারিভাবে চাষীদের উদ্বুদ্ধ করলে, প্রয়োজনীয় চারা, কৃষি উপাদান, প্রশিক্ষণ ও ব্যাংক ঋণ প্রদান করা হলে এবং উৎপাদিত কমলালেবু বাজারজাতকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সারা বিশ্ববাসীর আকর্ষণীয় ফল কমলালেবু উৎপাদনে দেশের চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। আলোচ্য মহাসড়ক নির্মাণ হলে এ এলাকার দুর্গমতা হ্রাস পাবে, দ্রুত পরিবহন সুবিধা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থকরী ফসল কমলালেবু চাষ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।

এক সময়ে দুর্গাপুর উপজেলার সুসঙ্গ মহারাজাদের সীমান্তবর্তী বিজয়পুর নামক স্থানে একটি চা বাগান ছিল। পাকিস্তান হওয়ার পর সুসঙ্গ মহারাজ পরিবার ভারত গমন করলে পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এ চা বাগানের অস্তিত্ব লোপ পায়। সীমান্ত এলাকায় চা চাষ যে সম্ভব এ উদাহরণ তাই প্রমাণ করে। বাংলাদেশ চা বোর্ড এ এলাকায় চা-চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু প্রধান অন্তরায় এ এলাকার দুর্গমতা। কাজেই আলোচ্য মহাসড়ক নির্মাণ এ বিষয়েও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

২) সিরামিক ও কাঁচ শিল্প স্থাপন: এ অঞ্চলে অতি উন্নতমানের সিলিকা বালি ও সাদা মাটি পাওয়া যায়। সাদা মাটি ও সিলিকা বালির পরিমাণ অফুরন্ত। কাজেই শিল্পায়নের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ অর্থাৎ গ্যাস বিদ্যুৎ, উদ্যোক্তা, পুঁজি এবং পরিবহন ইত্যাদির যোগান সঠিক হলে ও বাজারজাতকরণ সুবিধে প্রদান করা গেলে এ অঞ্চলকে পৃথিবীর অন্যতম সিরামিক ও কাঁচ শিল্প কারখানা অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

৩) সিমেন্ট শিল্প স্থাপন: চুনাপাথর সিমেন্ট শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। খাসিয়া পাহাড় শ্রেণীতে অপরিমেয় চুনাপাথর রয়েছে। তবে যেহেতু প্রায় সকল পাহাড়ই সীমান্তের ওপারে অর্থাৎ ভারতের, কাজেই এক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ অংশে মাটির নীচে চুনাপাথর রয়েছে তবে তা উত্তোলন ব্যয় অধিক বিধায় Cost Benefit হার ইতিবাচক নয়। এ পাহাড় শ্রেণী ভারত সীমান্তের অভ্যন্তরে ৫০-৬০ কিলোমিটার প্রশস্ত বিধায় ভারত কর্তৃক চুনাপাথর ৫০-৬০ কিলোমিটার ৪-৭ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ী পথ পাড়ি দিয়ে তাদের কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা অথবা উত্তোলিত চুনাপাথর তাদের দেশে বাজারজাতকরণে Cost Benefit Ratio কোনদিনও ইতিবাচক হবে না। তাই ভারতের চুনাপাথর কাঁচামাল হিসেবে বাংলাদেশের সাথে যৌথ মালিকানায় শিল্প (সিমেন্ট এবং অন্যবিধ) প্রতিষ্ঠা করে ব্যবহার করা ভারতের স্বার্থের অনুকূল বিবেচিত হবে। তাই ভারত এ ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হবে। এমনকি বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রয়োজনীয় শুল্ক দিয়ে চুনাপাথর বিদেশে বাজারজাতকরণেও ভারতের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। তাই এ বিষয়ে যৌথ ব্যবসায়ে পারস্পরিক স্বার্থ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করা যেতে পারে। ভারতের সাথে চুনাপাথরভিত্তিক যৌথ শিল্প স্থাপন করায় ঐকমত্য হলে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল চুনাপাথরের অফুরন্ত ভান্ডার দ্বারা বাংলাদেশের অংশে পৃথিবীর বৃহত্তম সিমেন্ট শিল্প কারখানা অঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য যথাযথ উদ্যোগ বাংলাদেশকেই নিতে হবে এবং খোলা মন নিয়ে ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে সীমান্ত অঞ্চলকে সিমেন্ট শিল্প অঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

৪) পর্যটন শিল্পের প্রসার: পর্যটন শিল্পে একটি কথা আছে Some roads leads to destination and some roads are itself a destination ” গারো খাসিয়া জৈন্তা পাহাড় শ্রেণীর পাদদেশ ধরে আলোচ্য পূর্ব-পশ্চিম মহাসড়কের জন্য এ কথাটি যথার্থ। একপাশে দিগন্ত বিস্তৃত হাওর অপর পাশে শ্যামল সবুজে ঘেরা সুউচ্চ পাহাড়, এমন পথে চলা প্রতিটি মানুষের জন্যই চমকপ্রদ মধুর স্মৃতি। একটি মজার বিষয় এদেশের অনেকেরই অজানা যে গারো খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের বুক চিরে যে সমস্ত নদী বাংলাদেশে পতিত হয়েছে সবগুলোতেই নীল পানি (ইষঁব ডধঃবৎ) প্রবাহিত। আমার প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল সম্ভবত এ আকাশের রঙেরই প্রতিফলন। কিন্তু সব কয়টি নদী- যাদুকাটা, পিয়াইন, গুয়াইন, ঢাউকী, এমনকি লালাখাল- এসব নদীর পানি নীল। নীল হওয়ার সম্ভবত একটিই কারণ। আর তা হল- পানির সাথে পাহাড়ের চুনাপাথর ও অন্যান্য খনিজ পদার্থের বিক্রিয়া। পানি পাহাড়ী নদীতে প্রবাহিত হওয়ার সময় পথে পথে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নীল রঙ ধারণ করে। মিসরের নীল নদীর পানি নীল না হলেও আমাদের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের নদীর পানি নীল। তাই নদীর নীল পানি পর্যটককে আলাদা আনন্দ ও কৌতুহলোদ্দীপ্ত করে তুলবে। তা’ছাড়া এ পাহাড় শ্রেণীর পাদদেশে গারো, খাসিয়াসহ বহু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনাচরণ- চেহারা, পোশাক, খাদ্য, বাসস্থান, সংস্কৃতি ইত্যাদি পৃথিবীর সকল মানুষেরই প্রচণ্ড আকর্ষণ। তাহেরপুর এলাকায় এ পাহাড়ের পাশেই টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ওটঈঘ কর্তৃক জীববৈচিত্র্য রক্ষাকল্পে অভয়ারণ্য ঘোষণা করে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে ইহা চমৎকার এক পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের শিল্পায়নে বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক, কাঁচ ও পর্যটন শিল্পে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চল অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। এজন্য বিদ্যমান কাঁচা সড়ককে আরও সম্প্রসারিত করে মহাসড়কে পরিণত করা একটি অন্যতম অপরিহার্য পদক্ষেপ। সুবিবেচিত হলে রেলপথও নির্মাণ সম্ভব। বিদ্যমান নৌ-পরিবহন ব্যবস্থারও উন্নয়ন প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি আমাদের প্রতিবেশী বন্ধুদেশ ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে চুনাপাথর, কয়লাভিত্তিক শিল্প ও বাণিজ্যে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নব দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করবে। আর একই সাথে পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ ও সুযোগ-সুবিধে আয়োজন করে বিশ্বমানের পর্যটন এলাকাও গড়া যেতে পারে। এজন্য চাই বাস্তব পরিকল্পনা, চাই উদ্যম ও দৃঢ় ইচ্ছা আর চাই বিনিয়োগ। দেশের বেকার সমস্যা, দারিদ্র্য, শিল্প ও প্রগতির সমস্যাসহ অনেক সমস্যারই সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে এ অঞ্চলে।

[লেখক : মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান ভূঞা, কমিশনার, রাজশাহী বিভাগ, রাজশাহী হিসেব কর্মরত।]

Rel. URL: http://www.ittefaq.com/content/2009/11/13/news0901.htm

 

Advertisement

Ntv
Sheltech
Immigration
Gplex
Primer Bank
Sel
Pran Foods
Sydney
Banglar Fashion
LiveOutsource
24hourscall
Mozilla Firefox

Bookmark and Share


More Informations

Bangla Font Problem

Advertisement

Boromela

Bddl

Bridging