ক্যামন আছো?
প্রশ্ন করা হলে মুহূর্ত মাত্র দেরি না করে ওদের জবাব ‘বেশ ভালো আছি।’
ধাক্কা না খেয়ে উপায় কী? রাজধানীর কোন শিশুতো এভাবে কথা বলে না। অথচ বরাবর অবহেলিত জনপদ হিসেবে জেনে আসা ‘লামা’র পাহাড়ি শিশুরা রাতারাতি কী করে এমন স্মার্ট হয়ে উঠছে! অবাক চোখে তাকাই শিশু যুগলের দিকে। একজন মানকিং মুরং, আর জনের নাম মনপ্রে মুরং। ওরা কোয়ান্টাম শিশু কাননের শিক্ষার্থী। অত:পর এই সূত্র ধরেইঃ বিস্ময় নিরসনের পালা? উহুঁ, বরং আরও বিস্ময়াভিভূত হওয়া!
কী কাণ্ডই না ঘটিয়ে ফেলেছে কোয়ান্টাম। নয়তো কী? দিনের পর দিন যে মানুষগুলো শেখার অধিকার বঞ্চিত, অবহেলিত জীবন যাপনকেই যারা আঁকড়ে ছিলো নিয়তি মনে করে, সেই দুর্গম এলাকার চেহারাটাই যে পাল্টে দেয়া হয়েছে! অন্ধকারে ছেয়ে থাকা পাহাড়েরর গায়ে শিশুরা ফুটে উঠছে আলোর ফুল হয়ে। সবই সম্ভব হয়েছে অনন্য এই বিদ্যাপীঠের দৌলতে।
শিশুদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়, কুশল বিনিময়ের পর এতোটা চমক অপেক্ষা করছিলো তা কে জানতো? পরদিন সকালে ওদের প্যারেড আর ডিসপ্লে দেখে ভিড়মি খাবার দশা! ‘প্রজাপতি, প্রজাপতি কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা’ গানের তালে শিশুরা যখন নাচছে, তখন আমাদের অন্তরের জিজ্ঞাসা- ‘কোথায় পেলে তোমরা এমন দারুণ দক্ষতা? ওদের নাচের নৈপুণ্যের কাছে রাজধানীর শিশুরা বুঝি হার মানতে বাধ্য। এরপর ‘আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী, সাথী মোদের ফুল পরি’ গানের সঙ্গে শিশুদের অবাক পরিবেশনায় আমরাও যে স্বপ্নচারী! সত্যিই তো, প্রকৃতির কোলে, এই পাহাড়ের ঢারে এসে, শিশু কাননের এইসব স্বর্গীয় ফুলের সুবাসে থাকা মানেতো স্বপ্নপুরীতেই বসবাস! কিন্তু এ যে সাময়িক। নগর জীবনের যান্ত্রিকতায় ‘দেশটা স্বপ্নপুরী’, শেষটায় এমনটি মেনে নেয়া বড় কঠিন বৈ-কি!
সেবার কথা শিল্পী সাংবাদিক ফাইজুস সালেহীনের সঙ্গে বান্দরবান বেড়াতে না গেলে স্বপ্নের মতো এমন সুন্দর অভিজ্ঞতা কী আর হতো! লামার পাহাড়ে বদলে যাওয়া জীবন ধারা দেখে বারবার মনে হচ্ছিলো, ইস, সত্যি সত্যি গোটা দেশটাই যদি এমন পরিচ্ছন্ন হয়ে যেতো!
অনন্য মানুষ গড়ার অঙ্গিকার নিয়ে দুস্থ-অসহায় শিশুদের মেধা ও দক্ষতা বিকাশের লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে এই শিশু কানন। ২০০০ সালে মাত্র সাত শিশু নিয়ে আবাসিক এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরু হয়। এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা বহুগুণে বেড়েছে। বাঙালি ছাড়াও আছে মুরং, মারমা, ত্রিপুরা, বম, খুশী, তঞ্চঙ্গা, খিয়াং, চাক ইত্যাদি আদিবাসী সমাজের শিশুরা।
আবাসিক হল ছাড়াও শিশু কাননে আছে বিশাল কমন রুম। বায়োগ্যাস প্লান্টের আলো ছাড়াও সন্ধ্যার পরপরই জেনারেটরের আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠে শিশু কাননসহ গোটা কোয়ান্টাম এরিয়া।
‘প্লে’ থেকে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত এই বিদ্যায়তনে ভর্তির জন্য প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে পরীক্ষা। অভিজ্ঞ টিম মৌখিক-লিখিত-ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যামে শিক্ষার্থী নির্বাচন করেন।
যথাযথ মেধা বিকাশে মূল পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি থাকছে নানা কর্মসূচি। চলছে নিয়মিত দেয়ালিকা প্রকাশ, সপ্তাহে দু’দিন সাংস্কৃতিক ক্লাস, প্রতিদিনের শারীরিক শিক্ষা, অ্যাসেম্বলি ও কোয়ান্টাম ব্যায়াম। ভর্তি হওয়া নতুনদের ভাষা সমস্যা দূর করার জন্য আছে কমিউনিকেটিভ বাংলা শিক্ষা কোর্স। সার্বিক কার্যক্রমের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য রয়েছে কমিটি।
শৃঙ্খলা আর নিয়মানুবর্তিতার দারুণ এক চর্চা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই শিশু কানন। যথাযথ মমতা, ভালোবাসা আর অধিকার দেয়া হলে পেছনে পড়ে থাকা কোনও সমাজের কিংবা অঞ্চলের শিশুরা কতটা ঝলসে উঠতে পারে, তাই বুঝিয়ে দিয়েছে কোয়ান্টাম। তাইতো বান্দরবান জেলা পর্যায়ে বিজয় দিবসের জাতীয় অনুষ্ঠানে বেশ ক’বছর যাবৎ টানা চ্যাম্পিয়ন হবার মতো গৌরবের অধিকারী এই ফুলকলিরা। এমন বাগানে কাটানো মুহূর্তগুলোকে জীবনের সেরা পর্ব বলে উল্লেখ করলেন স্কুল ইনচার্জ রাবেয়া ওয়াজিহা এবং ডিসপ্লে প্রশিক্ষক ফেরদৌসী জামান প্রতিভা।
শিশুদের প্রতিভা সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রশিক্ষক প্রতিভা বলেন, ‘রিহার্সেলের প্রথম দিন কয়েকজন বুঝিয়ে দেয়ার পর প্রায় ৪০ জন শিশু ‘ঢেউ’ অথ্যাৎ ডিসপ্লে’র সবচে’ কঠিন অংশটি করে ফেললো। তখনই বুঝে নিলাম, এরা অসাধারণ! একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠের মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে এই কোয়ান্টাম শিশু কানন‘কে। আগামীতে এমনি আদলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা গেলে সমাজের চেহারা যাবে বদলে। এখান থেকে বেরিয়ে আসা আলোকিত-অনন্য মানুষেরা সমাজের হাল ধরলে দেশকে দুর্নীতির শীর্ষে থাকবার বদনাম মাথা পেতে নিতে হবে না নিশ্চয়ই। বরং নীতিবোধ সম্পন্ন এই মানুষেরা সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ উপহার দেবেন। বান্দরবানের লামায় গিয়ে আপনিও দেখে আসুন স্বপ্নের স্বদেশ-মিনিয়েচার।
[লেখক : শাহেদ জাহিদী]
Ref. URL: http://www.ittefaq.com/content/2009/11/13/news0900.htm
| < Prev |
|---|























