সবেমাত্র ভোর হয়েছে। নরম আলো, ফুরফুরে বাতাস আর পাখির কলতান, সব মিলিয়ে সুন্দর পরিবেশ। এর মধ্যে গ্রামের এক প্রান্তে খোলা মাঠে বসেছে পাঠশালা। প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী। একটি কাঁঠালগাছে ঝোলানো ব্লাকবোর্ডের দিকে মুখ করে চটের ওপর দুই সারিতে বসেছে তারা। একদিকে রয়েছে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী, আরেক দিকে নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। এ ছাড়া মাদ্রাসার দাখিল শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও রয়েছে।
তরুণ শিক্ষক আবু রায়হান ও আফসানা আফরিনের কাছ থেকে তারা জেনে নিচ্ছে পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন জটিল বিষয়ের সমাধান। প্রথম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সব বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে, নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে শুধু অঙ্ক কষা ও ইংরেজি পড়ার সুযোগ। সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত একটানা চলল পাঠশালা। শিক্ষার্থীরা এবার বইখাতা গুছিয়ে বাড়ির পথে, স্কুলে যেতে হবে না।
সম্প্রতি জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট ইউনিয়নের শিকটা গ্রামে গিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এই পাঠশালার দেখা মেলে। তিন গ্রাম শিকটা, ধাপ ও বান্দাইলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এভাবেই জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে এ পাঠশালা। এখানে পাঠ্যবইয়ের বিষয় ছাড়াও অন্য বিষয় শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। এ জন্য কোনো বেতন দিতে হয় না, বরং তারা বিনামূল্যে বইখাতা ও কলম পেয়ে থাকে। পাঠশালায় শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতাসহ বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
শিকটা গ্রামের যে ১৫ জন উদ্যমী তরুণের উদ্যোগ ও নিরসল চেষ্টায় টানা চার বছর চলছে এই পাঠশালা চলছে, তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু রায়হান ও তৌহিদুল, বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজের ইকবাল হোসাইন, আমিনুল ইসলাম, মইনুল ইসলাম ও মোকাদ্দেস হোসেন, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজের আফসানা আফরিন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহমুদুল হাসান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিকুল ও রবিউল ইসলাম, বগুড়া বিআইটির কাইয়ুম এবং মেহেদী, মাসুদ, এরশাদ ও খলিল।
যেভাবে যাত্রা শুরু ২০০৫ সালের জুন মাস। ছুটিতে গ্রামে আসেন আবু রায়হান। অর্থাভাবে রাশেদুলের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার কথা জানতে পারেন তিনি। সংসারের অভাব মেটাতে রিকশাভ্যান চালাচ্ছিল রাশেদুল। এ ঘটনা নাড়া দেয় রায়হানকে। টিউশনি করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। এ টাকা তিনি ছেলেটির মায়ের হাতে তুলে দেন। আবার বিদ্যালয়ে যেতে শুরু করে রাশেদুল।
এখানেই থেমে থাকেননি রায়হান। গ্রামের গরিব ও মেধাবী ২০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে নিজ বাড়িতে পাঠশালা খুলে বসেন। এদিকে ছুটি শেষ হওয়ায় পাঠশালা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। গ্রামের বন্ধুবান্ধব ও সহপাঠীদের তিনি এ সমস্যার কথা জানান। তাঁকে সহযোগিতা করতে সোত্সাহে এগিয়ে আসেন বন্ধুরা। পাঠশালাকে আরও শক্তপায়ে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন তাঁরা।
শিকটা ছাড়াও ধাপ ও বান্দাইল গ্রামে গিয়ে শিক্ষার্থী জোগাড় করতে থাকেন তাঁরা সবাই। চাঁদা তুলে পাঠশালার জন্য চট, ব্লাকবোর্ড, চক, ডাস্টার, বই, খাতা, কলম কেনা হয়। নবোদ্যমে শুরু হয় পাঠশালা। এখনো তা চলছে।
আবু রায়হান বলেন, ‘দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে অনেক কষ্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। তাই নিজেকে বদলানোর পাশাপাশি অন্যকেও বদলে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করি। এ তাগিদ থেকেই বন্ধুদের নিয়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি।’
রায়হান জানান, শুরুতে বিভিন্ন বাড়ি উঠানে এ পাঠশালা বসত। এমনকি ফসলের ক্ষেতেও বসেছে। শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়ায় এখন শিকটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পাঠশালা বসছে। বৃষ্টি-বাদলের সময় বিদ্যালয়ের বারান্দায় চলে পাঠদান। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে পাঠশালায় নিয়মিত সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এ জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের এককালীন বৃত্তিও এবং অতিদরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মাসিক উপবৃত্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া বছরে একবার বিনা খরচে শিক্ষা সফরেরও ব্যবস্থা রয়েছে। পাঠশালার পক্ষ থেকে প্রতিবছর উপজেলার বিভিন্ন স্কুল থেকে এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পাঠশালায় জাতীয় সংগীত শুদ্ধভাবে গাওয়ার তালিম দেওয়া হয়। বসে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলার আসর। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন, মাদকবিরোধী প্রচার চালানো হয়। পাঠশালা পরিচালনার জন্য এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে ‘পাঠশালা পরিচালনা কমিটি’। উদ্যোক্তা বন্ধুরাসহ কমিটিতে ৩১ জন সদস্য রয়েছেন।
পাঠশালা চলছে যেভাবে: পাঠশালার ব্যয় নির্বাহের জন্য একটি তহবিল রয়েছে। এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে পাঠশালা পরিচালনা কমিটি। গ্রামবাসী মৌসুমি ফসল ধান, গম, আলু ইত্যাদি এ তহবিলে দান করে থাকে। এসব ফসল বিক্রি করে পাঠশালার খরচ জোগানো হয়। অনেকে নগদ টাকাও দেয়। পাঠশালার মূল উদ্যোক্তারাও প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিয়ে থাকেন।
পাঠশালায় নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষক নেই। গ্রামে থাকলে উদ্যোক্তারা নিজেরাই পালা করে পড়ান। রায়হান ও তাঁর বন্ধুরা প্রত্যেকেই কম-বেশি পাঠদানের সঙ্গে জড়িত। পড়াশোনার কারণে উদ্যোক্তাদের কারও পক্ষে গ্রামে থাকা সম্ভব না হলে আশপাশের কলেজের ছাত্রদের এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিনিময়ে পাঠশালা পরিচালনা কমিটির তহবিল থেকে কিছু সম্মানী দেওয়া হয় তাঁদের।
এ ব্যাপারে পাঠশালা পরিচালনা কমিটির উপদেষ্টা পুনট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল খালেক বলেন, এ পাঠশালার গুণে শুধু গরিব শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হচ্ছে না, গ্রামের সাধারণ মানুষও উপকৃত হচ্ছে। বাল্যবিবাহ, যৌতুক, মাদকদ্রব্য ইত্যাদির ক্ষতিকর প্রভাবের ব্যাপারে তাঁদের সচেতনতামূলক প্রচারে এরই মধ্যে আশপাশের অনেকেই সচেতন হয়ে উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের সাফল্য: টাকার অভাবে একসময় পড়াশোনা বন্ধ হতে বসেছিল শিকটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী ফারজানার। শিকটা দাখিল মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী শামিমা, সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী মমতাজ খাতুনসহ আরও অনেকে একই পরিস্থিতির শিকার হতে যাচ্ছিল। এসব শিক্ষার্থীর পাশে বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়েছে এ পাঠশালা।
পাঠশালার ছাত্র সোহেল আহমেদ ২০০৮ সালে পুনট উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে।পাঠশালার সহায়তায় এসএসসিতে ভালো ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বলে, ‘প্রতিদিন ভোরে বিনা পয়সার পাঠশালায় গিয়ে বিভিন্ন স্কুলের সবাই এক পরিবার হয়ে যেতাম। শিক্ষকেরা সেখানে বন্ধুর মতো পড়াতেন, বছরে একবার সবাই মিলে শিক্ষা সফরে গিয়ে খুব মজা করতাম।’২০০৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাঠশালার যেসব শিক্ষার্থী প্রশংসনীয় ফলাফল করেছে, তারা হলো হাসনা আক্তার, কল্পনা, রউফ, খাদিজা, মাহমুদুল ও রুমি।
এলাকাবাসী যা বলে: শিকটা গ্রামের কৃষক গোলাম মোহাম্মদ (৪৫) বলেন, ‘ছলগুলা তো হামাগেরে মাতার (মাথা) ওপর ছাতা হয়্যা দাঁড়াছে। ওরগেরে জন্যেই হামাগেরে মতো গরিব লোকের ছলপলেরা পড়ালেকা করবার পারোচো।’ পুনট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘নিজেদের বদলানোর পাশাপাশি সমাজটাকে বদলে দিয়ে শিকটা গ্রামের ওই শিক্ষিত তারুণ্যের দলটি এলাকায় রীতিমতো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’
কালাইয়ের উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলে এলাহী বলেন, ‘ওই ব্যতিক্রমী পাঠশালায় গিয়ে আমি অভিভূত হয়েছি।’
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-23/news/5666
| < Prev | Next > |
|---|























