Developmentbd.com

  • Increase font size
  • Default font size
  • Decrease font size
Home >> Education and Manpower >> Good News >> ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ‘উত্তম’ বন্ধু

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ‘উত্তম’ বন্ধু

E-mail Print PDF

অনেক স্বপ্ন নিয়ে ওরা বিদ্যালয়ে যায়। পড়াশোনা করে বড় হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, হাসি ফোটাবে বাবা-মায়ের মুখে। কিন্তু আর্থিক অনটন ও পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আটকে যায় পড়াশোনা। এভাবে একদিন ওদের স্বপ্নের কলি ফুল হয়ে বিকশিত হওয়ার আগেই ঝরে যায়। আর ওরাও ঝরে পড়ে বিদ্যালয় থেকে। এসব শিক্ষার্থীর জন্য রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দিঘা গ্রামে আছেন একজন বন্ধু, যিনি উত্তম চৌধুরী নামে পরিচিত।

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের আবার পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনার কাজ ১৫ বছর ধরে করে যাচ্ছেন উত্তম চৌধুরী। এসব শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি শুধু উত্সাহই জোগান না, নিজের টাকায় বই-খাতা কিনে দেওয়াসহ আনুষঙ্গিক খরচও জোগান। তাঁর সহযোগিতায় বাঘা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা নাটোরের বাগাতিপাড়া ও লালপুর উপজেলার অনেক শিক্ষার্থী নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে।

‘উত্তম’ হওয়ার নেপথ্যে: উত্তম চৌধুরীর প্রকৃত নাম সন্তোষ চৌধুরী। দিঘার ভূপেন্দ্রনাথ চৌধুরীর সাত সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। এসএসসি পরীক্ষায় পর পর তিনবার অকৃতকার্য হলে ‘উত্তম চৌধুরী’ নামে তিনি নিবন্ধন করেন। ১৯৯৩ সালে এই নতুন নামে তিনি এসএসসি পাস করেন। যথাসময়ে এইচএসসি পাস করলেও সাংসারিক ঝামেলায় আর পড়াশোনা হয়নি তাঁর।

১৯৯৫ সালে বাগাতিপাড়ার পাকা ইউনিয়নের গোফুরাবাদ গ্রামে স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। বিদ্যোত্সাহী উত্তম চৌধুরী নাওয়া-খাওয়া ভুলে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে লেগে থাকেন। শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগ দেখে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এতে বাদ সাধে। ২০০২ সালে বিদ্যালয়ে কারিগরি শাখা খোলা হলে উত্তম চৌধুরী এতে ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট (পরীক্ষাগার সহকারী) পদে নিয়োগ পান।

উত্তম চৌধুরী বলেন, ‘তিনবার এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে আমার বড় হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায়। এ জ্বালা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। কাজেই চোখের সামনে অনেক সম্ভাবনাময় শিশু আর্থিক অনটনের কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়লে খুব কষ্ট পাই। পড়াশোনা করতে না পারলে তারা কেউ দিনমজুর হবে, কেউ বা শ্রমিক হয়ে জীবনের ঘানি টানবে। তাদের এই কষ্টের কথা ভেবে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই।’ তিনি বলেন, ‘আমার জমি থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার খরচ চলে যায়। শুরুতে সংসার খরচ থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নতুন করে স্কুলে ভর্তি করাতাম। এখন স্কুল থেকে পাওয়া বেতনের পুরো টাকাই ওদের পেছনে খরচ করি। ওরা যখন ভালো ফল করে নতুন শ্রেণীতে ওঠে, পরবর্তী সময়ে ভালো চাকরি পায়, তখন আনন্দে আমার মনটা ভরে যায়। এটাই আমার বড় পাওয়া।’

উত্তমের স্ত্রী ডলি চৌধুরী বলেন, তাঁর স্বামী একজন পরোপকারী মানুষ। নিজের সংসারের চেয়ে অন্যের সন্তানদের পড়াশোনা নিয়েই তিনি বেশি ব্যস্ত থাকেন। উত্তমের দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ে সুপ্রিয়া সপ্তম ও ছেলে সৌরভ দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে।

শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও অনুভূতি: দিঘা গ্রামের শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে কৃষিকাজ শুরু করি। উত্তম স্যারের চেষ্টায় আবার বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এসএসসি পাস করে সেনাবাহিনীতে ঢুকি।’ তিনি জানান, উত্তম স্যারের উদ্যোগে এসএসসি পাস করে সেনাবাহিনীতে আরও চাকরি পেয়েছেন তাঁর বন্ধু রতন, রবিউল, মহসিন, সানোয়ার, হবিবুর ও মামুনুর রশিদ।

১৯৯৮ সালে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় মিলির বিয়ে হয়। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে আর পড়াতে চায়নি। খবর পেয়ে উত্তম তার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে পরিবারের লোকজনকে বুঝিয়ে মিলিকে বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে রাজি করান। বিনিময়ে বই, খাতা, কলম সরবরাহ ও পড়াশোনার সব খরচ বহনের দায়িত্ব নেন তিনি। মিলি জানায়, ২০০৭ সালে সে এসএসসি পাস করে এখন কলেজে পড়ছে। মিলি বলে, ‘উত্তম স্যারের কল্যাণে আমার মতো অনেক মেয়ের পড়াশোনার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।’

সম্প্রতি গোফুরাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে নবম ও দশম শ্রেণীতে পড়া এমন ২৬ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়, যারা শিক্ষাজীবন থেকে একপর্যায়ে ঝরে পড়েছিল। দশম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া তামিম ইকবাল বলে, ‘অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় আর্থিক অনটনের কারণে আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে উত্তম স্যার আমার পড়াশোনার খরচ চালানোর দায়িত্ব নেন। বইখাতা থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের বেতন পর্যন্ত—সব খরচ দিচ্ছেন উত্তম স্যার।’ তামিম তার স্কুল ব্যাগটি দেখিয়ে বলে, ‘এই ব্যাগটাও উত্তম স্যার কিনে দিয়েছেন।’ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সে বলে, ‘উত্তম স্যার আমার জীবনটা বদলে দিয়েছেন।’ একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ওয়াসিম, বিপ্লব, রমজান, লিজাসহ অনেকেই।

শিক্ষার উপকরণ দেন যাঁরা: উত্তম চৌধুরী বিদ্যালয় থেকে যে বেতন পান, শিক্ষার্থীদের বইখাতা, বেতন, পরীক্ষার ফরমসহ আনুষঙ্গিক খরচে তা শেষ হয়ে যায়। হাতে টাকা না থাকলে তিনি বাঘার আড়ানী বাজারের মডার্ন লাইব্রেরি, বীণাপাণি লাইব্রেরি ও লালপুরের লোকমানপুর বাজারের একটি বইয়ের দোকান থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বাকিতে বই কেনেন।বীণাপাণি লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী মিঠু জানান, উত্তম চৌধুরী তাঁর দোকান থেকে প্রচুর বই কেনেন। এ জন্য তাঁকে বাকিতেও বই দেন। বাকি টাকা সময়মতো পরিশোধ করে দেন।মডার্ন লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী রিংকু জানান, তাঁর লাইব্রেরিতে উত্তমের এখনো এক হাজার ৬০০ টাকা বকেয়া রয়েছে। তবে এ টাকা পরিশোধ নিয়ে তাঁর কোনো ভাবনা নেই। বরাবরই তিনি যথাসময়ে বাকি টাকা শোধ করেন।

শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধির মন্তব্য: গোফুরাবাদ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু সায়েম সরকার বলেন, ‘উত্তম সত্যিই শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন। আর্থিক অনটনে ঝরে পড়া অনেক শিক্ষার্থীর ভেতরেও যে অপার সম্ভাবনা আছে, এটি তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষকতা যে একটি মহান দায়িত্ব, উত্তম সবাইকে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন।’দিঘা কলেজের শিক্ষক মিলন বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া মানুষকে শিক্ষিত করে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ করে উত্তম চৌধুরী এলাকায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’

বাগাতিপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও লালপুর-বাগাতিপাড়া আসনের সাবেক সাংসদ নওশের আলী বলেন, ‘দারিদ্র্যের কারণে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে বাড়িতে বসে থাকে, সন্তোষ (উত্তম) তাদের নতুন করে স্কুলে ভর্তি করান, বই-পুস্তক কিনে দেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসব শিক্ষার্থীকে তিনি স্কুলে নিয়ে যান। তাঁর এই কাজ আমার খুব ভালো লাগে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে আমি সন্তোষের কথা বলি। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করতে বলি।

Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-23/news/5668

 

Advertisement

Ntv
Sheltech
Immigration
Gplex
Primer Bank
Sel
Pran Foods
Sydney
Banglar Fashion
LiveOutsource
24hourscall
Mozilla Firefox

Bookmark and Share


More Informations

Bangla Font Problem

Advertisement

Boromela

Bddl

Bridging