নীল-সাদা রঙের স্কুলের নির্ধারিত পোশাক পরে আসতে শিক্ষার্থীদের কদিন ধরেই চাপ দেওয়া হচ্ছিল। স্কুলের পোশাক পরে না এলে শাস্তি দেওয়া হবে এমন ভয়-ভীতিও দেখানো হচ্ছিল তাদের। দিন কয়েকের মধ্যে দেখা গেল ছাত্রছাত্রীরা স্কুলের পোশাক পরে নিয়মিত স্কুলে আসছে। ব্যতিক্রম শুধু নবম শ্রেণীর এক ছাত্রী ও দশম শ্রেণীর এক ছাত্র। পুরোনো, মলিন জামা গায়ে আর জোড়াতালি দেওয়া স্যান্ডেল পায়ে মেয়েটি স্কুলে আসে। ছেলেটির অবস্থাও তা-ই। ঘটনাটি চোখ এড়ায় না কক্সবাজারের রামু খিজারী আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার শিক্ষক মো. নিজাম উদ্দিনের।
খোঁজ নিয়ে জানলেন, ছাত্রীটির বাবা রিকশাচালক আর ছেলেটি বাজারে পান বিক্রি করে। তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। বাধ্য হয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাকে। ঘটনা দুটি শিক্ষক নিজামের মনকে নাড়া দেয়। তিনি কথা বলেন সহকর্মী সাহেদ সালাহউদ্দিন ও অরুণ দের সঙ্গে। তাঁরা ওই দুই শিক্ষার্থীকে স্কুলের পোশাক কিনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর স্কুলের অন্য শিক্ষকদের সহায়তায় গত জুনে ওই দুই ছেলে ও মেয়েকে স্কুলের পোশাক কিনে দেওয়া হয়।
এ পর্যন্ত এসেই থেমে যাননি ওই তিন শিক্ষক। অকালে ঝরেপড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কিছু একটা করার ইচ্ছা তাঁদের মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে। বিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার শিক্ষকদের সহায়তায় গঠন করা হয় একটি তহবিল। তাঁদের এ উদ্যোগকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মাটির ব্যাংকে তহবিল জোগাড় শুরু করে তারা। নাম দেওয়া হয় ‘আশার আলো’।
প্রধান উদ্যোক্তা বিদ্যালয়টির কারিগরি শাখার ওই তিন শিক্ষক জানান, অনেক ছাত্রছাত্রী আছে, যাদের বই, খাতা-কলম কেনার সামর্থ্য নেই। যাতায়াতের খরচের অভাবে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না। স্কুলের পোশাক কিনতে পারে না। অভাবের কারণে তাদের অনেকের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তাদের মধ্যে অনেকেই আছে খুব মেধাবী। এ ধরনের দরিদ্র-মেধাবী ছাত্রছাত্রীর পাশে দাঁড়াবে ‘আশার আলো’। তাঁরা আরও জানান, প্রতিদিনের খরচাপাতি থেকে এক-দুই টাকা বাঁচিয়ে দান করা কোনো বিষয়ই না। এই এক-দুই টাকায় অনেক শিক্ষার্থীর ঝরেপড়া রোধ করা সম্ভব।
শিক্ষক ইমরুল কায়েস, রুপম কুমার দাস জানান, ভর্তির পর প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে ঠিকই কিন্তু মে-জুনে পরীক্ষার আগে বকেয়া বেতন, পরীক্ষার ফি পরিশোধ করতে না পেরে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেয়। এমন শিক্ষার্থী এখানে অনেক আছে। তাঁরা জানান, এ বছর কারিগরি শাখায় নবম শ্রেণীতে ১১০ জন ও দশম শ্রেণীতে ৭৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩০-৪০ জন খুব দরিদ্র পরিবারের। বই, খাতা, পোশাক কিছুই কেনার সামর্থ্য নেই তাদের।
২ আগস্ট বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম মাটির ব্যাংকে ১০০ টাকা দান করে ‘আশার আলো’ তহবিলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর দশম শ্রেণীর ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের ছাত্র বায়েত উল্লাহ ও নবম শ্রেণীর সাইফুল ইসলাম মাটির ব্যাংকটি এক শ্রেণীকক্ষ থেকে অন্য কক্ষে নিয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্যে মাটির ব্যাংকে টাকা ফেলে। কেউ এক টাকা, কেউ দুই টাকা, আবার কেউ কেউ পাঁচ-দশ টাকাও ফেলে। শিক্ষকেরা যাঁর যাঁর সাধ্যমতো টাকা দেন।
কারিগরি শাখার ল্যাব. সহকারী জজ বাহাদুর দে ও রমজান আলী জানান, মাটির ব্যাংকটি রাখা হয় কারিগরি শাখার শিক্ষক মিলনায়তনে। সপ্তাহে প্রতি শনিবার শ্রেণীকক্ষের দুই দলনেতা তহবিল সংগ্রহের জন্য এটি শ্রেণীকক্ষে নিয়ে যায়। অন্যান্য দিন কোনো শিক্ষার্থী এ তহবিলে দান করতে চাইলে তারা শিক্ষককক্ষে আসে। প্রতি তিন মাস অন্তর ব্যাংকটি ভেঙে তহবিল হালনাগাদ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিনব এ উদ্যোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। শিক্ষার্থীরা অনেকেই টিফিন ও যাতায়াত খরচের টাকা বাঁচিয়ে এ তহবিলে দান করছে। প্রথম দিনেই প্রায় এক হাজার টাকা তহবিলে জমা পড়েছে বলে শিক্ষকেরা ধারণা করছেন।
প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম বলেন, এ তহবিল থেকে দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের বই, খাতা, কলম, স্কুলের পোশাকসহ শিক্ষাসামগ্রী কিনে দেওয়া হবে। সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল্লাহ জানান, সদিচ্ছা থাকলে অনেক ছোট উদ্যোগ থেকেও বড় কাজ করা যায়। বিন্দু থেকে সিন্ধু হয়। এভাবে এক-দুই টাকা জমে একদিন লাখ টাকা হবে।
অভিভাবক রশিদ আহমদ বলেন, অভাবের কারণে ছেলের পড়ালেখা কখন বন্ধ হয়ে যায়! সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতাম। ‘আশার আলো’র খবর শুনে এখন চিন্তামুক্ত হয়েছি।
কারিগরি শাখার নবম শ্রেণীর ছাত্র সৌরভ বড়ুয়া জানায়, প্রথম দিন মাটির ব্যাংকে সে পাঁচ টাকা দিয়েছে। দশম শ্রেণীর ছাত্রী রিমা আক্তার, সাদ্দাম হোসেন, নবম শ্রেণীর আসমাউল হোসনা বলে, ওই ব্যাংকে টাকা দিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য আবুল মনসুর বলেন, ‘এ উদ্যোগ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। প্রতিটি বিদ্যালয়ে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের হার অনেক কমে আসবে।’ রামু ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শারমিনা রেশমিন বলেন, আমাদের সবার উচিত এ রকম মহত্ একটি উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়ানো। এভাবেই সত্যিকারের দিনবদল সম্ভব।
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-23/news/5345
| Next > |
|---|























