গত বছর দ্বিতীয় শ্রেণীতে ২২তম স্থানে ছিল উ-কারফিউ রেংসাই। এ বছর তৃতীয় শ্রেণীতে সে উঠেছে প্রথম হয়ে। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের এই খাসি (খাসিয়া) আদিবাসী শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় চমক সৃষ্টির পেছনে রয়েছে এক ঘটনা।
উ-কারফিউ পড়াশোনায় দারুণ মনোযোগী হলেও বাংলা ভালো বুঝতে পারত না। পরে বিদ্যালয়ে খাসি শিক্ষক সীমা রাম্বাই এলেন; ক্রমে বাংলা আরও স্পষ্ট হয়ে এল উ-কারফিউয়ের কাছে। বাংলায় লেখা বিষয় খাসি ভাষায় বুঝিয়ে ভাষার জটিলতা দূর করে দিতে লাগলেন তিনি। তাঁর কল্যাণেই চূড়ান্ত পরীক্ষায় উ-কারফিউয়ের এই ভালো ফল।
সীমার সহযোগিতায় ওই বিদ্যালয়ের অন্যান্য আদিবাসী শিক্ষার্থীও সাফল্যের মুখ দেখেছে। সীমার মতো আরেকজন আদিবাসী শিক্ষক মার্কস রংসাই পড়ান একই ইউনিয়নের নকশিয়াপুঞ্জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দুই শিক্ষক মিলে ওই খাসি এলাকায় আদিবাসী শিশুদের ভাষার দূরত্ব ঘোচানোর জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের এই শ্রম একদিকে যেমন আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সহায়তা করছে, তেমনি রোধ করছে বিদ্যালয় থেকে তাদের ঝরে পড়া।
মেধার বিকাশ: সংগ্রামপুঞ্জির খাসিরা একসময় পানচাষের বাইরে আর কিছু ভাবতে পারত না। এসব পরিবারে শিক্ষার আলো ছড়াতে ১৯৭৪ সালে সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা ১৯৭৮ সালে সরকারি অনুমোদন পায়। শুরু থেকেই বিদ্যালয়ে শুধু বাংলাভাষী শিক্ষকেরা পাঠদান করে আসছেন। এতে ভাষা পরিষ্কার না বোঝায় আদিবাসী শিশুদের জন্য পড়াশোনা করাটা বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়ায়। ভাষাগত দূরত্বের কারণে অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী ঝরে গেছে বিদ্যালয় থেকে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মনিরউদ্দিন জানান, বিদ্যালয়ে এখন ১৫২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪১ জন আদিবাসী। শিক্ষকদের ভাষা ভালোভাবে বুঝতে না পেরে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা ঝরে যাওয়ায় এ অবস্থা। ২০০৮ সালের এপ্রিলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে সীমা রাম্বাই নামে একজন খাসি তরুণীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি অনেকটা দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন। এতে এসব শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ ঘটেছে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, উ-কারফিউ রেংসাই বাদে কা-মেরি রেংসাই, রিভাটি খংস্তিয়া, সাকেম পক্তাই, রমিয়েল খংস্তিয়া, সাইরা ডিখার—এসব খাসি শিক্ষার্থীও ভালো ফল করে তৃতীয় শ্রেণীতে উঠেছে।
ঝরে পড়া হ্রাস: সংগ্রামপুঞ্জির উত্তরে আরেক খাসি এলাকা নকশিয়াপুঞ্জিতে ১৯৫৭ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বিদ্যালয়ে ১১১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৬ জন আদিবাসী। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু রয়েছে পাত্র সম্প্রদায়ের।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদির জানান, গত বছরের এপ্রিলে মার্কস রংসাইকে নিয়োগ করা হয়। এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অনুমোদন রয়েছে। মার্কসের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমেছে। গত বছর আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার পাঁচ-ছয় শতাংশ ছিল। এ বছর গত ছয় মাসে এ হার তিন শতাংশে নেমে এসেছে। আবদুল কাদির বলেন, ‘বছর শেষে এই ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।’ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বানিয়েল লামিন জানান, এর আগে অনেক চেষ্টা করেও আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকানো যায়নি। আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ করায় ঝরে পড়ার হার এখন নেই বললেই চলে।
দুই শিক্ষকের কথা: সম্প্রতি এক সকালে নকশিয়াপুঞ্জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা হয় মার্কস রংসাইয়ের সঙ্গে। পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছিলেন তিনি। ক্লাসের ছাত্রী বালিশা পাত্রকে বলতে শোনা যায়, ‘পেড়েই দ্যা মেইট।’ পাশে বসা এক সহপাঠীকে এ কথা বলে সে। মার্কসের কাছে জানা গেল এই খাসি ভাষার মর্মার্থ। সহপাঠীকে মন দিয়ে পড়তে বলছে বালিশা। বিদ্যালয়ে সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক কে? নিজ ভাষায় এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মাঝপথে থেমে যায় বালিশা। মার্কস রংসাই বলেন, ‘ও নিজের ভাষায় জবাব দিতে চেয়েছিল, কিন্তু লজ্জা পেয়ে থেমে গেছে। তবে যেটুকু বলেছে, এর অর্থ হচ্ছে, ‘আমাদের নিজস্ব স্যার।’
বালিশার মতো অন্য আদিবাসী শিক্ষার্থীদের কাছেও মার্কস ‘নিজস্ব স্যার’ বলে পরিচিত। শুধু বিদ্যালয়ই নয়, পুরো এলাকায় এখন মার্কস রংসাইয়ের এ পরিচিতি। স্থানীয় অভিভাবকেরা বলেন, এ ধরনের সম্বোধনে আন্তরিকতা প্রকাশ পায়।মার্কস রংসাইয়ের ইচ্ছা, শিক্ষকতাকেই তিনি স্থায়ী পেশা হিসেবে নেবেন। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক পদে আবেদনও করেছেন। সিলেটের একটি কলেজ থেকে তিনি স্নাতক পাস করেছেন। মার্কস বলেন, ‘ছয়-সাত মাস ধরে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থেকে ওদের প্রতি একধরনের টান জন্মেছে। এ জন্য এ পেশায় থেকে যাব বলে ঠিক করেছি।’
সীমা রাম্বাইও তাঁর এলাকায় ‘নিজস্ব শিক্ষক’ বলে পরিচিত। চার বোন ও এক ভাইয়ের পরিবারে সীমা রাম্বাই একমাত্র শিক্ষিত। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিতে ইচ্ছুক সীমা জানান, এইচএসসি পাস করার পর পরিবারের আর্থিক দৈন্যের কারণে তিনি এই খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন। তাঁর কথা, পড়াশোনার বেলায় বিভিন্ন বিষয় একদম শুরু থেকে নিজ ভাষায় বুঝতে পারলে এর ফল ভালো হয়।
পেছনে যাঁদের অবদান: সংগ্রামপুঞ্জি ও নকশিয়াপুঞ্জির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষকদের পাঠদানের ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রয়েছে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (একডো)। পুরো প্রক্রিয়াটি তারা সমন্বয় করছে। এতে অর্থসহায়তা দিচ্ছে অক্সফাম-জিবি। আগে খণ্ডকালীন দুই আদিবাসী শিক্ষককে প্রতি মাসে এক হাজার ২০০ টাকা করে সম্মানীভাতা দেওয়া হতো। সাফল্য পাওয়ায় এখন প্রত্যেককে মাসে দুই হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে।
একডোর নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বলেন, ‘সিলেটে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগের দাবি অনেক দিনের। এ দাবি পূরণ হলে সাফল্য আসবে, তা দেখাতে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে দুটি বিদ্যালয়ে দুজন আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ করি এবং লক্ষ্য অর্জনে সফল হই। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এ সাফল্য দেখছেন। এখন সরকারিভাবে যদি আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ করা হয়, তাহলে তারা উপকৃত হবে।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মাহবুব এলাহী বলেন, ‘আমি শুরু থেকে আদিবাসী শিক্ষক দিয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের পাঠদানের প্রক্রিয়াটি কাছ থেকে দেখছি। আমার কাছে এটি ভালো দৃষ্টান্ত বলে মনে হয়েছে।’
সিলেটের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ব্যবস্থা চালু করতে সরকারিভাবে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে উপপরিচালক বলেন, ‘ঢাকায় অনুষ্ঠিত আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জাতীয় সম্মেলনে আমি গিয়েছিলাম। সম্মেলনে একই দাবি ওঠায় বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। সরকারিভাবে নির্দেশ পেলে এ ব্যাপারে অবশ্যই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-23/news/5669
| < Prev | Next > |
|---|























