Developmentbd.com

  • Increase font size
  • Default font size
  • Decrease font size
Home >> Food and Agriculture >> Good News >> ‘হাঁড়িভাঙা’ আমের হাঁড়ির খবর

‘হাঁড়িভাঙা’ আমের হাঁড়ির খবর

E-mail Print PDF

আমটির সঙ্গে যাদের পরিচয় নেই, নাম শুনেই তারা হোঁচট খাবে। হাঁড়িভাঙা! এ আবার কেমন নাম? স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয় ফল আমের নাম হবে বাহারি। গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি, তোতাপুরি, কোহিতুর, লক্ষ্মণভোগ, হিমসাগর, মোহনভোগ, আম্রপালি—আরও কত কি। এর মধ্যে খাপছাড়া ‘হাঁড়িভাঙা’ কেন? এ নামের পেছনে রয়েছে এক মজার ঘটনা। আর যারা এ আমের স্বাদ একবার নিয়েছে, হাঁড়িভাঙা বলতে তারা অজ্ঞান। রংপুরের বিভিন্ন উপজেলাসহ আশপাশের জেলায় গেলে এর প্রমাণ মেলে।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ হচ্ছে। মাঠের পর মাঠ জুড়ে আমবাগান। ভরা মৌসুম বলে গোটা উপজেলা হাঁড়িভাঙায় সয়লাব। সেখানে এখন কেউ আম পাড়ছে, কেউ খাঁচায় ভরছে, কেউবা আবার আঁটি পর্যন্ত চেটেপুটে খেতে ব্যস্ত। ঘরবাড়ি, উঠান, আড়ত, বাজার—সবখানে শুধু হাঁড়িভাঙার দাপট। সুস্বাদু এই আম কিনে ক্রেতাদের যেমন রসনা তৃপ্ত হচ্ছে, অন্য দিকে এই আম বেচে বাগানের মালিকেরাও পাচ্ছেন ভালো দাম।

হাঁড়িভাঙা আমের বাণিজ্যিক চাষের অগ্রদূত উপজেলার টেকানী গ্রামের লুত্ফর রহমান (৫৫)। এ আম থেকে মোটা অর্থ আয়ের বিষয়টি তাঁর মাথায় প্রথম খেলে। তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয় এলাকার লোকজন। এভাবে ছড়িয়ে পড়ে হাঁড়িভাঙার চাষ। স্থানীয় কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, উপজেলায় আমচাষির সংখ্যা এখন ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ১৫টি ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে।

নামের রহস্য: এলাকায় জনশ্রুতি আছে, প্রায় ১০০ বছর আগে সোহরাব কাসারি নামের একজন মৃৎশিল্পী ছিলেন মিঠাপুকুরের উঁচাবালুয়া গ্রামে। অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির হাঁড়ি-পাতিল ফেরি করতেন তিনি। একবার ভারতের কোনো এক এলাকা থেকে তিনি একটি আম নিয়ে আসেন। খাওয়ার পর আমের আঁটি তিনি বাড়ির পেছনে একটি ভাঙা হাঁড়ির ভেতর ফেলেন। সেখানে জন্ম নেয় আমের চারা। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এটি। তারপর একসময় গাছে মুকুল আসে, মুকুল থেকে জন্ম নেয় থোকা থোকা আম। আমটি খেতে খুব সুস্বাদু হওয়ায় গ্রামবাসীর মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। অনেকেই আমটির নাম খুঁজতে থাকে। কিন্তু কেউ নাম বলতে পারেনি। ভাঙা হাঁড়ির ভেতর জন্ম বলে শেষে সোহরাব কাসারি নিজেই এই আমের নাম দেন ‘হাঁড়িভাঙা’। তখন থেকে আমটি এ নামেই পরিচিত।

১৯৫০ সালে উঁচাবালুয়া গ্রাম থেকে ওই আমের একটি চারা নিয়ে আসেন টেকানী গ্রামের নফলউদ্দিন। বাড়ির পাশে মসজিদের সামনে চারাটি লাগান তিনি। গাছটি বড় হয়ে এখন নফলউদ্দিনের ছেলে আমজাদ হোসেনের (৪২) সংসার চালানোর বিরাট অবলম্বন হয়েছে। এ বছর তিনি ওই গাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকার আম বিক্রি করেছেন।

১৯৮৮ সালে আমজাদ হোসেনের চাচাতো ভাই লুত্ফর রহমান নিজেদের জমিতে হাঁড়িভাঙার চাষ শুরু করেন। তাঁর সাফল্য দেখে অন্যরাও এ পথ ধরেন। এভাবে গত ২০ বছরে মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলায় হাঁড়িভাঙা আম চাষের নীরব বিপ্লব ঘটে যায়। আম চাষ ও বিপণনকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে বিশাল এক আমের বাজার।

লুত্ফর যা বলেন: টেকানী গ্রামের লুত্ফর রহমানকে পাওয়া যায় তাঁর আমবাগানে। তাঁর লোকজন গাছ থেকে আম পেড়ে খাঁচায় ভরছিল। ছবির মতো সাজানো আমবাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি শোনান আম চাষের গল্প।

লুত্ফর ১৯৮৮ সালে হাঁড়িভাঙার ৩০টি চারা তৈরি করে ৪০ শতক উঁচু জমিতে রোপণ করেন। তিন বছরের মাথায় এসব গাছের আম বিক্রি করে পান ১৫ হাজার টাকা। ফসলের চেয়ে খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং লাভ অনেক বেশি হওয়ায় তিনি আরও চারা লাগানোর কথা ভাবেন। ১৯৯১ সালে আরও দুই বিঘা জমিতে তিনি আমবাগান গড়ে তোলেন।

লুত্ফর জানান, ১৯৯৪ সালে এক একর ৪০ শতক জমির আম বিক্রি করে তিনি প্রায় এক লাখ টাকা পান। এরপর আরও জমি কিনে মোট সাত বিঘা জমিতে আমগাছ লাগান। এবার তাঁর পাঁচ বিঘা জমির বাগানে আম এসেছে। বাগানের সব আম তিনি এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেছেন পাঁচ লাখ টাকায়।

আম বিক্রির টাকায় লুত্ফর জমি কিনেছেন, বাড়িঘর পাকা করেছেন। তাঁর বাড়ির আঙিনায়ও রয়েছে হাঁড়িভাঙার গাছ। এসব আমগাছ দেখিয়ে লুত্ফর বলেন, ‘বাহে আম নোয়ায়, এইগল্যা (এগুলো) যোন টাকার গাছ। একনা গাছোত পাত (পাতা) যত না, আম বেচাইলে টাকাও পামো তত না (ততো)। আমোত কোন লস নাই। কোন খরচও নাই, বাহে। খালি ৪০০-৫০০ টাকার সার-ওষুধ দিলে পাঁচ বছর বয়সী একেকটা গাছোত লাভ হইবে কম করি চার হাজার টাকা। অ্যার মতোন আর কোনো শসোত (শস্যে) লাভ নাই। উঁচা-নিছা সউগ জমিত এই আম চাষ করি লাভ হয়।’

ভাগ্য ফিরল যাঁদের: লুত্ফরের পরামর্শে এলাকার অনেক মানুষ হাঁড়িভাঙার চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখেছেন। সম্প্রতি মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের পদাগঞ্জ, উত্তরপাড়া, সরকারপড়া, মাদ্রাসাপাড়া, আছারপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামে আম নিয়ে মানুষের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। গ্রামের সব বয়সী নারী-পুরুষ গাছ থেকে আম পাড়তে ও খাঁচায় ভরতে ব্যস্ত।

পদাগঞ্জের বিধবা মনোয়ারা খাতুন জানান, আগে অন্যের বাড়িতে ও আমবাগানে মজুরের কাজ করতেন। বাড়ির সামনে ছয় শতক জমি ও আঙিনায় হাঁড়িভাঙার বেশ কিছু চারা লাগিয়ে তিন বছরের মাথায় সংসারে সচ্ছলতা আনতে পেরেছেন। এখন আম বিক্রি ও গাভি পালনের মাধ্যমে মনোয়ারা স্বাবলম্বী এবং ৮০ শতক জমির মালিক। তিন মেয়েকে তিনি বিয়ে দিয়েছেন।

পাইকারের হাট গ্রামের আমচাষি মকবুল ১৯৯৯ সালে এক বিঘা জমিতে হাঁড়িভাঙার চাষ শুরু করেন। তিন বছর পর গাছে আম ধরতে শুরু করলে লাভের মুখ দেখেন তিনি।খোড়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশিদ প্রথমে এক বিঘা জমিতে আম চাষ করেন। আম বিক্রি করে অনেক টাকা পাওয়ার পর আরও জমিতে চারা লাগান। এখন তিনি তিন বিঘা জমিতে আমবাগান গড়ে তুলেছেন।

সরকারপাড়া গ্রামের হোসেন মিয়া জানান, তিন বিঘা জমিতে তিনি ধান, আলু ও বরবটির চাষ করতেন। কয়েক বছর আগে এসব জমিতে হাঁড়িভাঙা আমের বাগান করেছেন। জমির ফসল বিক্রি করে আগে বছরে তাঁর লাভ হতো ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা, এখন তিনি বাগানের আম বিক্রি করে পান চার লাখ টাকা।

খরচ কম, লাভ বেশি: মিঠাপুকুর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রহিম মণ্ডল বলেন, ১৫ ফুট পর পর প্রতি একরে ৮০টি হাঁড়িভাঙা আমের চারা রোপণ করা যায়। অনেক গাছে এক বছরে ফল ধরতে শুরু করে। মাঝারি প্রতিটি গাছে সার ও কীটনাশক বাবদ বছরে খরচ হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। দুই বছর ধরে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হাঁড়িভাঙা আম প্রতি কেজি ১০০ টাকার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ বছর বয়সী প্রতিটি গাছের আম বিক্রি করে গড়ে চার হাজার টাকা পাওয়া যায়। আমগাছের ফাঁকে ফাঁকে হলুদসহ নানা রকম সবজি সাথি ফসল হিসেবে আবাদ করা যায়। এতে এক একর জমিতে বছরে সব মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকা পাওয়া যায়।

ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে আম সংগ্রহ করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার হাটবাজারে নিয়ে যান। এসব হাটবাজারে এই আম ভালো দামে বিক্রি হয়। বর্তমানে মিঠাপুকুরের আড়তগুলোতেই ৪০ কেজি আম সাড়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা আম কিনতে মিঠাপুকুরের এসব আড়তে আসেন। পদাগঞ্জ বাজারের আড়তদার মতিয়ার রহমান বলেন, মৌসুমের তিন মাস আম বেচাকেনা হলেও জুন ও জুলাই মাসে বাজার জমজমাট থাকে। পদাগঞ্জ বাজারে আম কিনতে আসা টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ী সাবুল মিয়া (৪২) জানান, চার বছর ধরে তিনি হাঁড়িভাঙা আমের ব্যবসা করছেন। বছরে মাত্র তিন মাস এই আমের ব্যবসা হয়। আর এতেই তাঁর সারা বছরের জীবিকা চলে।

Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-23/news/5667

 

Advertisement

Ntv
Sheltech
Immigration
Gplex
Primer Bank
Sel
Pran Foods
Sydney
Banglar Fashion
LiveOutsource
24hourscall
Mozilla Firefox

Bookmark and Share


More Informations

Bangla Font Problem

Advertisement

Boromela

Bddl

Bridging