সবুজ বিপ্লবের পথে বাংলাদেশ।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ নেই। নতুন বিনিয়োগও প্রায় বন্ধ। ব্যাংক বসে আছে টাকা নিয়ে। গতানুগতিক বিনিয়োগের ধারা থেকে বের হতে পারছে না ব্যবসায়ী বা অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানগুলোও। দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির চিত্র যখন এমনটিতে এসে ঠেকেছে তখন নিরবে সবুজ বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি খাতে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন কৃষক। কৃষির উপকরণ সহজতর করা ও কৃষকের হাতে সময়তম টাকা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও পুরো উদ্যোমে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা নিয়ে পৌঁছে গেছে কৃষকের কাছে। সরকারের পক্ষ থেকেও দাম কমানো হয়েছে সার-ডিজেলের। সব মিলিয়ে কৃষি প্রধান এই দেশ সামগ্রিক কৃষি বিপ্লবের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান।
গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির পুনঃজাগরণ ঘটাতে এই প্রথম প্রত্যন্ত গ্রামে চলে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নবনিযুক্ত ৮৩ জন সহকারী পরিচালককে নিয়ে গঠিত ৩৫টি টিম ‘কৃষকের জন্য যাত্রা’ শুরু করবে। আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশিক্ষণ একাডেমী থেকে এই যাত্রা শুরু হবে। তারা অঞ্চল ভিক্তিক কৃষির সম্ভাবনা যাচাই-বাছাই করার পাশাপাশি কৃষকের ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চলতি ২০০৯-১০ অর্থ বছরে প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে কৃষি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশের ব্যাংকগুলো মোট ১ হাজার ৯১২ কোটি ৩৭ লাখ টাকার সম পরিমাণ কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে। যা গত অর্থ বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। আসন্ন বোরো মৌসুমে তা আরো বাড়বে বলে জানিয়েছেন ড. আতিউর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০০৯-১০ অর্থ বছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাধ্যমে ১০ শতাংশ সুদে ভূমিহীন বর্গাচাষীদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ৫০০ কোটি টাকায় প্রায় ৫ লাখ বর্গাচাষী কৃষককে ঋণ দেয়া হবে। এছাড়া বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দেয়া আড়াই হাজার কোটি টাকা কৃষি ঋণ আরো অন্তত ১০ লাখ কৃষককে দেয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তিনি বলেন, কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ছাড়াও সরকারি মালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বাকি ঋণ ঠিক কতজন কৃষকের হাতে পৌঁছবে তা বলা সম্ভব না হলেও ঋণ প্রাপ্ত কৃষকের সংখ্যা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। যার মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব বা সবুজ বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, শুধু কৃষি ঋণের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ বিতরণের পাশাপাশি ‘উচ্চ ফলনশীল’ শস্য উৎপাদন এবং কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেয়া হবে। ইতিমধ্যে এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের শস্য বহুমুখীকরণের জন্য বড় ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। শিগগিরই আমরা এই বিষয়টির নিয়ে কাজ শুরু করব। এছাড়া ব্যাংকের টাকায় গ্রামাঞ্চলে শস্য গুদাম তৈরিরও কাজ শুরু হয়েছে। আমরা চাই কৃষি বিপ্লব ঘটাতে। ইতিমধ্যে বেশ এগিয়ে গেছি। এবার উত্তবঙ্গে মঙ্গার প্রভাব নেই। রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর এলাকায় এবছর কৃষির বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের কারণে আমরা বড় বিনিয়োগে যেতে পারছি না। যে কারণে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র হচ্ছে কৃষি ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিচ্ছি। যেখানে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমি সেই দিনের অপেক্ষায় বসে আছি যেই দিন ব্যাংকগুলো কৃষককে খুজবে ঋণ দিতে। এখনই তা শুরু হয়ে গেছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো কৃষি খাতে বিনিয়োগের জন্য এগিয়ে আসছে। গ্রামের কৃষকের ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে গ্রামে গ্রামে যাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা।
এছাড়াও হাওর-বাঁওড়, চরাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের কাছে কৃষি ঋণ পৌঁছে দেয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান নিজেই বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। ইতিমধ্যে সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, জয়পুরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তিনি নিজে উপস্থিত থেকে কৃষকের মাঝে ঋণ বিতরণ করছেন।
সম্প্রতি নন ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি এবং ডিএপি সারের দাম আরেক দফা কমিয়েছে সরকার। আসন্ন বোরো মৌসুমে কৃষি উৎপাদন খরচ কমাতে সরকার ডিজেলে ভর্তুকি ও বিদ্যুতে ছাড় দিতে যাচ্ছে। এবিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সারের নতুন দাম অনুযায়ী ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) দাম ৪০ টাকার ২২ টাকা, মিউরেট অফ পটাশ (এমওপি) ৩৫ থেকে ২৫ টাকা এবং ডায়া-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ৪৫ থেকে ৩০ টাকায় নেমে আসলো। কৃষক পর্যায়ে এ মূল্যে সার বিক্রি হবে। অবশ্য ডিলার পর্যায়ে টিএসপি ২০, এমওপি ২৩ এবং ডিএপি ২৮ টাকা দামে বিক্রি হবে। দাম কমানোর ফলে সরকারকে এ খাতে অতিরিক্ত পাঁচশ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এছাড়াও কৃষি উৎপাদন খরচ কমাতে এবার ডিজেলে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। কৃষি কাজে ব্যবহার করা সেচ চালাতে যে ডিজেল প্রয়োজন সেখানে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হবে। একই সাথে সেচ যন্ত্র চালাতে বিদ্যুতেও ছাড় দেয়া হবে ২০ ভাগ । সব মিলিয়ে এবছর কৃষিতে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেবে সরকার। কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করার ফলে কৃষি বিপ্লব ঘটাতে আরো সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে জানান ড. আতিউর রহমান। Ref. URL: http://www.ittefaq.com/content/2009/11/10/news0296.htm
| < Prev | Next > |
|---|























