দুই দশক আগেও আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে ছোট মাছ পাওয়া যেত। প্রাকৃতিক অভয়াশ্রমগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়া, কৃষি জমিতে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক প্রয়োগ, অবৈধ কারেন্টজালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে আমাদের দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে রয়েছে অনেক প্রজাতির দেশি মাছ।
তার মধ্যে খলিশা মাছ অন্যতম। অনেকটা নেশায় এবং কিছুটা পেশাদারিত্বের কারণে আমি এসব ছোট ছোট মাছের প্রজননের চেষ্টা করেছিলাম। কোন কোন মাছের ক্ষেত্রে প্রজননে সফলতা লাভ করলেও বাণিজ্যিকভাবে সফল হইনি। তার মধ্যে খলিশা অন্যতম। অবশ্য খলিশা মাছকে অ্যাকুরিয়াম মাছ হিসাবে ব্যবহার বাড়াতে পারলে বাণিজ্যিকভাবে এর সফলতা আনা সম্ভব হত। সে চেষ্টা আমি করিনি। শুধু পোনা উৎপাদন পর্যন-ই যতটুকু সফলতা।
আমার হ্যাচারির পাশেই ছোট একটি বিল ছিল। যেটা এখন আর নেই। বৈশাখ মাসে একদিন বৃষ্টির পর আমি এই বিলের ধারে হাঁটছি। হঠাৎ দেখি কয়েকটি ছোট মাছ জটলা করছে। আমি চুপচাপ দেখছি। কিছুক্ষণ পর দেখি মাছগুলোর মুখ থেকে বুদবুদ বের হচ্ছে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে এসব বুদবুদ এক জায়গায় জড়ো হয়ে বড় ফেনার সৃষ্টি হল।
সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আর অপেক্ষা না করে বাড়ি ফিরে আসি। পরদিন ভোরবেলায় গিয়ে দেখি ফেনার স্তুপটা বেশ বড় হয়েছে। আমি বুঝতে পারি এই ফেনার স্তুপ আর কিছুই না, মাছের ডিম পাড়ার একটা আবাসস্থল। তখনই আমি ওই ফেনার স্তুপটাকে পানিসহ পাতিলে তুলে আমার হ্যাচারিতে নিয়ে এসে একটি ছোট সিস্টার্নে রাখি। দু’দিন পর ফেনার স্তুপের ভেতর ছোট ছোট মাছের বাচ্চা দেখা গেল। আমি খুব উৎসাহে মাছের বাচ্চাগুলো সিস্টার্নেই লালন পালন করতে থাকি। ২০ দিন পর এই মাছগুলো ধানী পোনাতে রূপান-রিত হলে নার্সারি পুকুরে ছাড়ি। এভাবে প্রায় ১০ দিন রাখার পর মাছের পোনাগুলো বড় হল। বোঝা গেল এগুলো খলিশা মাছের বাচ্চা।
এভাবেই জানতে পারি খলিশা মাছের খালে-বিলে প্রাকৃতিকভাবে ডিম পাড়া থেকে পোনা উৎপাদনের কৌশল। এরপর ২০০২ সালের কথা। পাশের বিল থেকে শ’পাঁচেক ব্রুড খলিশা মাছ সংগ্রহ করি। শীতের পরে এরা কৃত্রিম খাবারে অভ্যস- হল। মে মাসের দিকে মাছগুলোর পেটে ডিম এল। বিভিন্ন মাত্রায় হরমোনের ডোজ দেয়া হল। অনেক অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে খলিশা মাছের কৃত্রিম প্রজনন শেষ পর্যন্ত সফলতা লাভ করে।
প্রজননের জন্য স্ত্রী ও পুরুষ খলিশা মাছ বাছাই : সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত খলিশা মাছের প্রজনন কাল। এই সময়ে স্ত্রী খলিশা মাছের পেট ভর্তি ডিম থাকে। স্ত্রী খলিশা মাছ থেকে পুরুষ খলিশা মাছের চেনার উপায় হল পুরুষ খলিশা মাছের রং লালচে উজ্জ্বল সবুজাভ হয়ে থাকে। তা ছাড়া স্ত্রী মাছের চেয়ে পুরুষ খলিশা মাছ সামান্য বড় হয়।
হরমোন ইঞ্জেকশনের দ্রবণ তৈরি এবং ইঞ্জেকশন দেয়ার পদ্ধতি : কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রথমে মাছ বাছাই করে সমপরিমাণ পুরুষ ও স্ত্রী মাছ বাছাইয়ের পর পি.জি. দ্রবণের ইঞ্জেকশন দিতে হয়। ইঞ্জেকশনের জন্য একটি স্ত্রী মাছের জন্য একটি পুরুষ মাছের প্রয়োজন। মাত্র একটি ডোজেই খলিশা মাছ ডিম দেয়। প্রতি কেজি মাছের জন্য ১০ মিঃ গ্রাঃ পি.জি. এবং একই সাথে পুরুষ মাছকে ৪ মিঃ গ্রাঃ ইঞ্জেকশন দিয়ে সিস্টার্নে রাখতে হবে। ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে এরা ডিম দিয়ে থাকে। এখানে মনে রাখতে হবে যে, খলিশা মাছ খুবই লাজুক প্রকৃতির মাছ। এরা সব সময় সিস্টার্নের এক কোণায় অবস্থান করে। যে কারণে ইঞ্জেকশন দেয়ার পরেও শুধুমাত্র উপযুক্ত পরিবেশের কারণে এরা ডিম পাড়ে না। এ কারণে ডিম দেয়ার জন্য খুব নীরব এবং অন্ধকার জায়গায় প্রয়োজন।
খলিশা মাছের ডিম পানিতে ভেসে থাকে। ২০ ঘণ্টার মধ্যেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চার বয়স ৩ দিন হলে সিদ্ধ ডিমের কুসুম ছেকে খাবার হিসাবে দিতে হবে।
নার্সারি পুকুর ব্যবস্থপনা : পুকুর প্রস্তুত করে শ্যালো মেশিনের পরিষ্কার পানি দিয়ে তিনদিন বয়সের রেনুকে নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর করতে হবে। নার্সারির পানিতে কোন প্রকার প্যাংকটন রাখা যাবে না। খাবার হিসাবে প্রথম সপ্তাহ ডিমের কুসুম এবং দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আটাসিদ্ধ করে খাওয়ানোর পর তৃতীয় সপ্তাহ থেকে নার্সারি খাবার দিতে হবে। এভাবে এক মাস খাওয়ানোর পর এক ইঞ্চি সাইজের হয়ে যাবে।
চাষ পদ্ধতি : খলিশা মাছের একক চাষ খুব একটা লাভজনক নয়। যারা হ্যাচারির মালিক বা নিজেরা পোনা উৎপাদন করতে পারেন তারা খলিশা মাছের প্রজনন করিয়ে মিশ্রভাবে এই মাছ চাষ করতে পারেন। তবে খলিশা মাছ অ্যাকুরিয়াম ফিস হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি অ্যাকুরিয়াম ফিস হিসাবে ব্যবহারের প্রচলন করা যায় তবে এই মাছ চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে।
-এ.কে.এম.নূরুল হক, ব্রহ্মপুত্র ফিস সিড কমপেক্স (হ্যাচারি), ময়মনসিংহ
Ref. URL: http://www.ittefaq.com/content/2009/11/08/news0572.htm
| < Prev | Next > |
|---|























