(শেষ কিস্তি)
১৮৯৮ সালের একই ফৌজদারি কার্যবিধি ভারত ও পাকিস্তানে চালু ছিল। ভারত ও পাকিস্তানে এ আইনটি এখন কেমন চলছে? ভারতে ১৯৭৩ সালে ফৌজদারি কার্যবিধিকে নতুন করে প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই নতুন ফৌজদারি কার্যবিধির ধারাগুলোর ভাষা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আগের মতো অবিকৃত রাখা হয়েছে। তবে আগের ১৮ অধ্যায় অর্থাৎ কমিটাল পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সেশন কেসে আগের ১৮ অধ্যায়ের মতো ইনকোয়ারির বা অনুসন্ধানের বিধান নেই।
ভারতের ফৌজদারি কার্যবিধিতে বর্তমান ১৮ অধ্যায়ে সেশন জজের বিচার-পদ্ধতি এবং ২৯ অধ্যায়ের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচার-পদ্ধতি আছে। এ উভয় আদালতের বিচার-ব্যবস্থার বিধানগুলো আমাদের বর্তমানের বিচার-ব্যবস্থার মতো। অর্থাৎ আমাদের ফৌজদারি বিচার-ব্যবস্থা ভারতের বিচার-ব্যবস্থার মতো। পাকিস্তানেও ১৯৭৬ সালে ১৮ অধ্যায় বা কমিটাল পদ্ধতি বাতিল হয়েছে, তবে ভারতের মতো সম্পূর্ণ ফৌজদারি কার্যবিধি পরিবর্তিত না হলেও মৌলিকভাবে সংশোধন করা হয়েছে। আমাদের দেশে কমিটাল পদ্ধতি বিলুপ্তির কারণে বিচার-ব্যবস্থার কুফল আমরা ইতিমধ্যেই পেতে শুরু করেছি। কারণ, ভারত ও পাকিস্তানেও এর কুফল আসতে বাধ্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ভারত-পাকিস্তানে বিচার-ব্যবস্থায়ও এ কুফল নিঃশব্দে আসতে শুরু করেছে। আমার মতে, এ ১৮ অধ্যায় অবলুপ্তির কারণে আমাদের দেশের বিচার-ব্যবস্থায় অপরাধীরা খালাস পাওয়ার বিরাট সুযোগ পেয়েছেন।
অপরাধীদের যাতে সুষ্ঠু বিচার হয়, সে জন্য যে ব্যবস্থা করা আবশ্যক, সরকারকে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যে দেশে জনগোষ্ঠী যেমন, সে দেশে তেমন বিচার-ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। পুলিশের তদন্ত একমাত্র তদন্ত বিবেচনা মনে করা যাবে না। সব মোকদ্দমার মধ্যে মারাত্মক অপরাধগুলো, যেমন: হত্যা, নারী নির্যাতন, ডাকাতি ও যাবজ্জীবন শাস্তিযোগ্য অপরাধের জন্য (Grand sessions case) হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে আগের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮ অধ্যায়ের মতো ইনকোয়ারি করা উচিত। সেশন আদালতের শাস্তিযোগ্য অপরাধের মামলাগুলো শুধু সেশন জজ ও অতিরিক্ত সেশন জজ দিয়ে বিচার করা উচিত। এ সেশন কোর্টে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের মতো প্রাইভেট অপরাধের মোকদ্দমা বিচার করায় সেশন জজের যথেষ্ট সময় অপচয় হচ্ছে, যে কারণে হত্যা, ডাকাতির মামলাগুলো সঠিক গুরুত্ব পাচ্ছে না। তা ছাড়া অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার মাধ্যমে সব সাক্ষীর বক্তব্য গ্রহণ করার বিধান করা আবশ্যক। এতে বড় ধরনের অপরাধের বিচারে আসামির বিচারকে আগের মতো এড়িয়ে যেতে পারবে না। এর ফলে জনগণের মধ্যে বিচারের প্রতি আস্থা আসবে। অপরদিকে অন্যান্য ছোট সেশন মোকদ্দমা ক্ষুদ্র অপরাধের মামলা হিসেবে বর্তমানের পদ্ধতিতে বিচার করা যেতে পারে। জনগণকে বিচার পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আইন আছে, আদালত আছে, বিচারক আছে, অথচ জনগণ বিচার পাবে না, বাদী কেঁদে মরবে, অপরাধী হেসে-খেলে বেড়াবে—এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিচার দিতে গেলে যা যা করা আবশ্যক, তা-ই করতে হবে। ন্যায়বিচার প্রদানের জন্য সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটার দরকার হলেও হাঁটতে হবে, উত্তম উপায় বের করতে হবে। আমাদের দেশে বাদীপক্ষ মোকদ্দমায় অপরাধ প্রমাণ করে থাকে, অপরদিকে আসামি ডকে নির্বিঘ্নে দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু ‘আমি নির্দোষ’ বলে খালাস পেয়ে যায়। দোষী প্রমাণ হওয়ার আগ পর্যন্ত আসামি নির্দোষ Innocent till proved guilty (দোষী প্রমাণিত হওয়ায় আগ পর্যন্ত নির্দোষ) অর্থাৎ accusatorial (দ্বন্দ্বমূলক) পদ্ধতিতে বিচার হয়। অপরদিকে ফরাসি দেশে আসামিকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হয়। কারণ, ওখানে Guilty till proved innocent (নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত দোষী) অর্থাৎ Inquisitorial (অনুসন্ধানমূলক) পদ্ধতিতে বিচার হয়। ওপারে ইংল্যান্ডে একধরনের বিচার-পদ্ধতি এবং এপারে ফ্রান্সে অন্য ধরনের বিচার-পদ্ধতি। আসলে মাটি ভিন্ন, মানুষ ভিন্ন, ইতিহাস ভিন্ন—এ জন্য তাদের আচার-আচরণও ভিন্ন। তবে উদ্দেশ্য অভিন্ন—সেটা হচ্ছে বিচারপ্রার্থীকে সঠিক বিচার প্রদান করা। বিচার যেকোনো পদ্ধতিতে হোক না কেন, মূলকথা বিচার আবশ্যক। দোষী ব্যক্তিকে সাজা খাটতে হবে, এটাই সারকথা—যা কিনা আমাদের দেশে বিরল। আমাদের দেশের বিচার-ব্যবস্থা ইংরেজদের বিচার-পদ্ধতি অর্থাৎ Anglo-Saxon বিচার-পদ্ধতি থেকে এসেছে। আমি এর বিপক্ষে নই; অপরদিকে ফরাসি পদ্ধতিরও বিপক্ষে নই। তবে যে পদ্ধতিই হোক না কেন, অপরাধীদের যাতে শাস্তি দেওয়া যায়, এমন পদ্ধতি আমাদের জন্য প্রয়োগ করতে হবে। বিচার-পদ্ধতির ত্রুটির কারণে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাবে, এমন বিষয়কে আমরা কোনোমতেই মেনে নিতে পারি না। আমি একজন আইনজীবী হিসেবে বলতে পারি, আমাদের দেশে ১৯৭৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি সংস্কারের কারণেই অপরাধীরা শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য সরকারের উচিত, বিষয়টিকে গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ফৌজদারি বিচার-ব্যবস্থার সংস্কার করা।
লেখক আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-22/news/21024
| Next > |
|---|























