অর্থ জোগাড় আর বাস্তবায়নের দুশ্চিন্তা নিয়েই যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় সংশোধিত দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি)। দলিলটির খসড়া চূড়ান্ত হলেও এখনো তা অনুমোদন দেয়নি সরকার। তবে তা সময়ের ব্যাপার মাত্র। ২০০৯-১১ এই দুই বছরই হচ্ছে এর বাস্তবায়নকাল। দুই বছরে এর বাস্তবায়নব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থ সংগ্রহ ও কৌশলপত্রের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্ষমতা নিয়ে সরকার নিজেও কিছুটা চিন্তাগ্রস্ত।
২৪ সেপ্টেম্বর উন্নয়নসহযোগীদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়টি খোলাখুলি স্বীকারও করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, ‘পিআরএসপি বাস্তবায়নে আমাদের ঘাটতি এক হাজার ৬৫৮ কোটি ডলার। গত তিন বছরে বাংলাদেশে বৈদেশিক-সহায়তা এসেছে ৬০০ কোটি ডলারের কিছু বেশি। সেই বিচারে দুই বছরে দেড় হাজার কোটি ডলারের কিছু বেশি পাওয়া উচ্চাভিলাষী।’ এর পরও তিনি আশাবাদী, এটা অর্জন সম্ভব।
পাশাপাশি বাস্তবায়ন-সক্ষমতা ও পর্যবেক্ষণের দুর্বলতা-সম্পর্কিত উন্নয়নসহযোগীদের উদ্বেগের কথা অকপটে মেনে নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, তাদের এই উদ্বেগের সঙ্গে তাঁর কোনো মতপার্থক্য নেই। তবে সরকার দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
সেদিন উন্নয়নসহযোগীদের নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যে উন্নয়নসহযোগী সংগঠন ডিএফআইডির কান্ট্রি হেড ক্রিস অস্টিন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি বৈশ্বিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে ঈর্ষণীয়। তবে আরও ভালো করার ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনার দৃঢ় পদক্ষেপ দরকার। পিআরএসপি বর্তমান সরকারের একটি রাজনৈতিক দলিল। তারা কীভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করতে চায়, দুর্নীতি কমাতে চায়, শাসনব্যবস্থার উন্নতি করতে চায়, তা এতে লিপিবদ্ধ আছে। উন্নয়নসহযোগীদের সঙ্গে এ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে মাত্র।’
পিআরএসপি বাস্তবায়নে ঘাটতি পূরণে দাতারা কী পরিমাণ অর্থ সহায়তা দেবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কোনো কিছুই বলেননি তিনি। শুধু বললেন, ‘উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।’
তবে দাতাদের সঙ্গে আলোচনার আগে ১৫ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় পিআরএসপির সংশোধিত দলিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। দলিলটি উত্থাপন এবং এর সংক্ষিপ্ত সার উপস্থাপন করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে দলিলটি নিয়ে আলোচনা হয়। মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেয় খসড়াটি জাতীয়ভাবে বিবেচনার জন্য প্রথমে সংসদে পেশ করা হবে এবং তারপর উন্নয়নসহযোগীদের দেওয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে দলিলটি চূড়ান্ত করা হবে। তবে বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দ্বিতীয় পিআরএসপির পর আর এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা করা হবে না। বরং এই সরকারের মেয়াদেই তৈরি করা হবে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, যার বাস্তবায়নকাল হবে ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ সময় পর্যন্ত।
পরিকল্পনামন্ত্রী সংসদে দ্বিতীয় পিআরএসপি উপস্থাপন করে বলেন, চারদলীয় জোট সরকারের সময় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়নি। প্রথম পিআরএসপির বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৮ সালে। এর কোনো মূল্যায়ন ছাড়াই ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্বিতীয় পিআরএসপি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে চায়। সে জন্য ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা ও নীতিমালা বিবেচনা করে অন্তর্বর্তীকালীন দ্বিতীয় পিআরএসপি প্রণয়ন করা হয়েছে। আর ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদকাল ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত।
মন্ত্রিপরিষদে ও সংসদে আলোচনার জন্য পিআরএসপির যে দলিলটি তৈরি করা হয়েছে, তাতে বাস্তবায়নসহ সম্পদ সংগ্রহের পুরো পরিকল্পনাই তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, কীভাবে তিন লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জোগাড় হবে। মোট ব্যয়ের সিংহভাগই জোগাড় হবে স্থানীয় উত্স থেকে, যার পরিমাণ দুই লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। আর বাকি এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা উন্নয়নসহযোগীদের কাছ থেকে কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগ্রহ করা হবে। এ সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছে যথাক্রমে সাড়ে পাঁচ ও ছয় শতাংশ।
দ্বিতীয় দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্রে পাঁচটি মূল কৌশল ও পাঁচটি সহায়ক কৌশল চিহ্নিত করা হয়েছে। পাঁচটি মূল কৌশল হিসেবে বলা হয়েছে, দারিদ্র্যবান্ধব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। পাঁচটি সহায়ক কৌশল হলো, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সব জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক ক্ষমতায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কার্যকর জনসেবা প্রদান, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিবেশ ও আবহাওয়া পরিবর্তন মোকাবিলা এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে উত্পাদনক্ষমতা বৃদ্ধি।
কৌশলপত্রে আগামী দুই বছরের লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে দারিদ্র্যবান্ধব প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সামষ্টিক অর্থনীতির যেসব ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ আছে, সেগুলোর উল্লেখ করা হয়। কৌশলপত্রের সংক্ষিপ্ত সারে এ সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে বলা হয়েছে প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া। চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলা হয়েছে, জিডিপিতে বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি, রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে স্থিতিশীলতা, রপ্তানি কার্যক্রমে অগ্রগতি, রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে স্থিতিশীলতা, ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তিকে উত্পাদনশীল খাত নিয়োজিত রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা।
তবে অর্থ জোগাড় ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এখনই সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেছেন। তাঁদের মতে, বিশ্বমন্দার মধ্যে স্থানীয় ও বিদেশি সব উত্স থেকে এই বিপুল সম্পদ জোগাড় করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। আর বাস্তবায়নের সময়ও বেশি নেই। ফলে কাগজে-কলমে যা বলা হয়, এর হয়তো আংশিক রূপ বাস্তবায়িত হতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু ইচ্ছা পোষণ করলেই তা বাস্তবায়ন করা যায় না, অনেক চেষ্টা করেও বার্ষিক এডিপির জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করা যায়নি। আর বিশ্বমন্দার মধ্যে উন্নয়নসহযোগীদের কাছ থেকে দুই বছরে ১৬৫৮ কোটি ডলার পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।’ গত ১০ বছরে বিদেশি সাহায্যের প্রকৃত প্রাপ্তি যোগ করলেও এর সমান হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-26/news/8348
| < Prev | Next > |
|---|























