কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের নরম বালুচরে পা দিতেই চোখে পড়বে লালবাহিনীর অস্তিত্ব। সৈকতে হাঁটাচলার সময় হঠাত্ বেজে ওঠা বাঁশির শব্দ আতঙ্কিত করতে পারে আপনাকে। আপনি এদিক-ওদিক তাকালেন। দেখলেন লোকজনের দৌড়াদৌড়ি। লালবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল সাগরে। অক্লান্ত চেষ্টার পর উদ্ধার করে নিয়ে এল কাউকে। দুঃখ, অভিমান, অসতর্কতায় কত প্রাণ এই সাগরের বুকে ঝরে যেত তার ঠিক নেই, যদি না এই লালবাহিনী পাশে এসে দাঁড়াত। মাথার টুপি, পরনের শার্ট ও প্যান্ট লাল বলে এদের ‘লালবাহিনী’ বলা হয়। হাজার হাজার পর্যটকের জীবন রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করছেন এই বাহিনীর সদস্যরা।
এই লালবাহিনী আর কেউ নয়, একদল সাহসী মানুষ, যাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে সমুদ্রের বুক থেকে বিপদগ্রস্ত পর্যটকদের উদ্ধার করেন। যাঁদের বলা হয় সফল ডুবুরি। ডানকানের অর্থে প্রতিষ্ঠিত বলেই মানুষের কাছে তাঁরা ‘ডানকানের লালবাহিনী’ নামে বেশি পরিচিত।
ইয়াসির লাইফ গার্ড: ১৯৯৫ সালের ২৩ অক্টোবর। কক্সবাজারে বেড়াতে এসে অনেকের মতো সমুদ্রে নামে ঢাকার একটি কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র মিনহাজ উদ্দিন ইয়াসির। সঙ্গে বাবা-মা ও একমাত্র ছোট বোন। একসময় বাবা শাহাবুদ্দিন দেখেন, তাঁদের পাশে ইয়াসির নেই। দেখতে পেলেন, ভাটির প্রবল টানে ইয়াসির গভীর সাগরে ভেসে যাচ্ছে। একপর্যায়ে সে হারিয়ে যায় সাগরে। তিন দিন সাগরে তন্নতন্ন করেও খুঁজলেও পাওয়া যায়নি ইয়াসিরকে। চতুর্থ দিন তার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায় ১২ কিলোমিটার দূরে মহেশখালীর সাগর চ্যানেলে, যা আটকে ছিল স্থানীয় জেলেদের জালে।
ইয়াসিরের বাবা শাহাবুদ্দিন আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ডানকান ব্রাদার্স বাংলাদেশের নির্বাহী ব্যবস্থাপক। একমাত্র ছেলের এভাবে মৃত্যু তাঁকে প্রচণ্ড নাড়া দেয়। তার মৃত্যুর কথা জানতে পারেন ডানকান ব্রাদার্সের বিদেশি কর্মকর্তারা। তাঁরা আরও শুনতে পান, কক্সবাজার সমুদ্রে গোসলরত পর্যটকেরা বিপদে পড়লে তাদের রক্ষার কেউ নেই। তখন তাঁরা নিজেরাই এগিয়ে এলেন। ইয়াসিরের স্মরণে গড়ে তুললেন ‘ইয়াসির লাইফ গার্ড স্টেশন’। সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টের কোল ঘেঁষে ঝাউবাগানের পাশে এক একর জমির ওপর প্রায় আট লাখ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয় এই লাইফ গার্ড স্টেশন। স্টেশনের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৬ সালের ২২ অক্টোবর। নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত আটজন প্রশিক্ষিত ডুবুরি দিয়ে শুরু হয় সাগরে ভেসে যাওয়া মানুষের প্রাণ রক্ষার এই মহতী উদ্যোগ।
৩৯৭ পর্যটকের প্রাণ রক্ষা: লাইফ গার্ড স্টেশনের পরিচালক মোস্তফা কামাল (৪৮) জানান, প্রতিষ্ঠার পর ১৩ বছরে তাঁরা ৩৯৭ জন পর্যটকের জীবন বাঁচিয়েছেন। বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার মুথুরাপাড়ার বাসিন্দা মোস্তফা কামালের সঙ্গে বর্তমানে সহযোদ্ধা হিসেবে জীবন রক্ষার কাজ করছেন আকতার হোসেন, মোহাম্মদ হাশেম, মোজাম্মেল হক, জিয়াউর রহমান, সাহিনুর ইসলাম, মোস্তাক আহমদ ও মোহাম্মদ বাহার। মোস্তফা কামাল জানান, তাঁর সহযোগীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে আজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ‘লালবাহিনী’।
দোতলাবিশিষ্ট ইয়াসির লাইফ গার্ড স্টেশনের নিচতলায় থাকেন এই যোদ্ধারা। ওপরের তলায় অফিস ও ছাদে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। সমুদ্রচরের মূল পয়েন্টের চার কিলোমিটারে (কলাতলী থেকে ডায়াবেটিক হাসপাতাল পয়েন্ট পর্যন্ত) রয়েছে তাঁদের চারটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ডুবুরিরা টাওয়ারে উঠে পর্যটকদের দিকে নজর রাখেন। আছে দুটি ভ্রাম্যমাণ দল। এক দলের হাতে বাঁশি আর অন্যদলের হাতে থাকে মেগাফোন। দুর্ঘটনার সংবাদ পেলেই বাঁশি বাজিয়ে বা মেগাফোনে লোকজনকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। এরপর লালবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে সাগরে। সাগরে নামার জন্য আছে স্পিডবোট। আর উদ্ধার করা মুমূর্ষু পর্যটকদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স।
সুখের সাগরে দুঃখের কাহিনী: ১ আগস্ট ২০০৯। বেলা সাড়ে ১১টা। সৈকতের লাবণী পয়েন্টে গোসল করতে নেমে চোরাবালিতে আটকে নিখোঁজ হন চট্টগ্রামের চকবাজার বড় মসজিদ এলাকার তানজিনা আকতার (২০)। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে দেখে স্পিডবোট নিয়ে লালবাহিনীর সদস্যরা ঝাঁপিয়ে পড়েন সাগরে। আধাঘণ্টার মধ্যে তাঁরা তানজিনাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।২০ জুলাই ২০০৯। দুপুর দেড়টা। সৈকতের লাবণী পয়েন্টে সাগরে নামেন ঢাকার নিপুণ (৩০) ও তাঁর স্ত্রী নিনিয়া (২৫)। একপর্যায়ে এই পর্যটক দম্পতি গুপ্ত খালে আটকা পড়ে নিখোঁজ হন। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে দেখে সাগরে নেমে তাঁদের উদ্ধার করেন লালবাহিনীর ডুবুরিরা।
কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনাও আছে। ২৫ জুলাই ২০০৮। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া। ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। সাগরও উত্তাল। আবহাওয়া বার্তায় তিন নম্বর সতর্কসংকেত চলছে। এক তরুণী হঠাত্ সৈকতে এসে হাজির। জনশূন্য সৈকতে তরুণীর উপস্থিতি লালবাহিনীর সদস্যদের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। একজন গিয়ে বললেন, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে আপনি কেন সৈকতে এলেন? হোটেলে ফিরে যান। ওই তরুণী সে কথা কানে তুললেন না। সৈকত ধরে হাঁটতে হাঁটতে একপর্যায়ে তিনি উত্তাল সাগরে ঝাঁপ দেন। লালবাহিনীর তিন সদস্য উদ্ধার করে আনেন ওই তরুণীকে। সাগর সমান ক্ষোভ, দুঃখ, বেদনা নিয়ে সাগরে আত্মাহুতি দিতে যাওয়ার এমন বেদনাদায়ক কাহিনী আরও আছে। কিন্তু এই লালবাহিনীর জন্য এ কাহিনী সব সময় বিয়োগান্তক থাকেনি।
তবুও মৃত্যু: ১৯ জুলাই ২০০৯। বেলা সাড়ে ১১টায় সমুদ্রসৈকতের কলাতলী মডার্ন হ্যাচারি এলাকায় গোসল করতে নামেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নওয়াজিবুল কবির। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ। সতর্ক নজরদারির পরও এভাবে সমুদ্রে হারিয়ে যান অনেকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সৈকতে গোসল করতে নেমে গত সাত বছরে ৫৮ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।
নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা নেই: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার ৮ আগস্ট ঢাকা থেকে বাবা-মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন। সকাল সাড়ে ১০টায় হোটেল থেকে তাঁরা গোসল করতে সৈকতে নামেন। বাবা-মা ও ভাই একসঙ্গে কোমর সমান পানিতে নেমে গোসল করলেও কামরুন্নাহার নামতে পারেননি। তাঁর বাবা মিজানুর রহমান বলেন, কক্সবাজারে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বহু হোটেল-মোটেল তৈরি করা হয়। কিন্তু পর্যটকদের জন্য সৈকতে জাল দিয়ে ঘিরে নিরাপদ গোসলের জন্য কয়েক লাখ টাকা খরচ করার মানুষ নেই।
কুমিল্লা থেকে আসা আফজাল হোসেন জানান, কক্সবাজারে যারা ভ্রমণে আসে, তাদের প্রধান আকর্ষণ থাকে সমুদ্রে নেমে গোসল করা। কিন্তু এখানে নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক মায়ের কোল খালি হয়।ইয়াসির লাইফ গার্ডের পরিচালক মোস্তফা কামাল জানান, আনন্দভ্রমণে এসে মারা যাওয়ার ঘটনা সবাইকে দারুণভাবে আহত করে।
পতাকা দেখে সমুদ্রে নামুন: আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম। হাজার হাজার পর্যটক কক্সবাজারে আসবে। তাদের জন্য পরামর্শ হচ্ছে—সমুদ্রে নামার আগে বিলবোর্ডে জোয়ার-ভাটার হিসাব এবং বালুচরে ‘লাল’ ও ‘সবুজ’ পতাকা দেখে নেবেন। সাগরে যখন জোয়ার থাকে তখন বালুচরে ‘সবুজ’ পতাকা টাঙানো থাকে। এ সময় গোসল করা নিরাপদ। ভাটার সময় টাঙানো হয় ‘লাল পতাকা’। এ সময় গোসল করা বিপজ্জনক। ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ, লঘুচাপ সৃষ্টি হলে লাইফ গার্ড স্টেশনে লালবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং সৈকতজুড়ে লাল পতাকা তুলে লোকজনকে সতর্ক করা হয়।
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-21/news/5672
| Next > |
|---|























