বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার কাজলাহার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সন্ধ্যা নদী। নদীর দুই পাশে কিছুদূর পর পর জেগে ওঠা চর চোখে পড়বে। সন্ধ্যা নদী ভরাট করে ভূমিহীনদের জন্য আবাসন প্রকল্প তৈরির কাজ চলছে। জেলা প্রশাসন আবাসন প্রকল্প তৈরির কাজ হাতে নিয়েছে। আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে পার্শ্ববর্তী সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতভিটা থেকে জোর করে মাটিও কাটা হচ্ছে। তা দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে সন্ধ্যা নদী। নদীর তীরবর্তী স্থানের মাটি কাটায় কাজলাহার গ্রামের বসতভিটা ভাঙনের মুখে পড়তে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার এর ফলে হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।
সন্ধ্যা নদী ভরাট করে আবাসন প্রকল্প করার উদ্যোগে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগও জানিয়েছে। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে স্থানীয় জনমতকে উপেক্ষা করে নেওয়া এই প্রকল্পের কাজ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বন্ধ ছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় প্রভাবশালীদের সমর্থন নিয়ে আবারো চলছে নদী ভরাটের কাজ।
সরেজমিন আশ্রয়ন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বালু দিয়ে নদীর যে অংশটি ভরাট করা হয়েছে তাতে এরই মধ্যে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্রোতস্বিনি এই নদীর ঢেউ এসে নিয়মিতভাবে কৃত্রিম এই চরটিতে আঘাত করায় বেশ কিছু স্থানে বালু সরে গেছে। চরের মধ্যে বালু আটকে রাখতে চারদিকে মাটি দিয়ে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। জোয়ারের সময় নদীর পানি সেই বাঁধ টপকে চরটি ডুবিয়ে ফেলছে। চরের মাঝ বরাবর বেশ কয়েকটি স্থান থেকে বালু সরে যেতেও দেখা গেছে।
আবাসন প্রকল্পের নামে কাজলাহার গ্রামের কৃষি জমির সেচের প্রধান উত্স হোতা খাল (সরু খাল) ভরাট করা হয়েছে। নদীর বুকে তৈরি করা চরে যাওয়ার জন্য রাস্তাও বানানো হয়েছে সেখানে। এতে সেচ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। অথচ সন্ধ্যা নদীর বেশ কিছু স্থানে একাধিক পরিণত চর রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে আছে।
আবাসন প্রকল্প তৈরির কাজ তত্ত্বাবধান করছেন বানারীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়নের সাবেক বিএনপি সভাপতি মোদাচ্ছের আলী ব্যাপারী। প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৩০ মেট্রিক টন চালের বিনিময়ে জেলা প্রশাসন তাকে এ কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছে। স্থানীয় ভূমি অফিস স্থান নির্বাচন করেছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। আগামী দেড় মাসের মধ্যে বালু ভরাট শেষ করে আবাসন প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। পরিণত চর থাকতে নদী ভরাট করে আবাসন গড়ে তোলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এতে দু’একজন মানুষের ক্ষতি হলেও কয়েকশ মানুষ লাভবান হবে।
তবে সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে গ্রামবাসী এমনকি এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরাও বলেন ভিন্ন কথা। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রথমেই এভাবে নদী ভরাটের বিরুদ্ধে এই প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ পরিদর্শকরা তাঁদের মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু তত্কালীন বিএনপি দলীয় সাংসদের সহকারি এবং বিএনপি দলীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও গ্রামের এক দালাল মিলে এই জায়গাটিকেই আবাসনের জন্য নির্ধারন করেন।
আবাসনের সঙ্গেই বসতবাড়ি রয়েছে প্রতিবেশী শিক্ষক ননী বড়াল, জেলে আব্দুল জলিল, কৃষক সুধাংশু মিস্ত্রী এবং মত্স্যজীবী রাখাল বিক্রমসহ অনেক মানুষের। তাঁরা জানান, প্রথমে গ্রামের গরীব কৃষকদের জমি দেওয়ার নামে এই প্রকল্প শুরু করে প্রভাবশালী মহলটি। এরপর এই গ্রামেরই এক দালালের সহায়তায় অনেকের কাছ থেকে টাকাও নেন।
শিক্ষক ননী বড়াল বলেন,‘আমি আমার জমির মাটি কাটায় বাঁধা দেই। এতে আমাকে লাঞ্জিত করা হয়। এরপর আর কেউ ওদের সামনে দাড়াতে সাহস পায়নি।’ বৃদ্ধ হরলাল মিস্ত্রী ও আব্দুল জলিল বলেন, আবাসন প্রকল্পটি উপজেলার কাছাকাছি টেকসই চরে হলে ভূমিহীনরা আত্মকর্মসংস্থানের পথ বেছে নিতে পারতো। আর গ্রামবাসীও তাঁদের কৃষি কাজসহ সব কাজকর্ম নির্বিঘ্নে করতে পারতো। অথচ টেকসই চরে আবাসন না করে, গ্রামবাসীর বাড়ি ঘর থেকে ন্যুনতম দুরত্ব না রেখে এই আবাসন প্রকল্পটি করা হচ্ছে।
হরলাল মিস্ত্রী বলেন, হয়তো আমাদেরকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিতেই এই কাজটি করছে প্রভাবশালী ওই মহলটি। তবে সেটিই যদি হয়, আমরা সবাই একযোগে গ্রাম ছেড়ে চলে যাবো।
এ ব্যাপারে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) আবুল কালাম আজাদ নদীর মধ্যে বালু দিয়ে আবাসন প্রকল্প তৈরির কথা স্বীকার করে বলেন, এই প্রকল্প তিন বছর আগে শুরু হয়েছে। আমি দেড় মাস হলো দায়িত্ব নিয়েছি। এ বিষয়ে যদি কোনো অভিযোগ আসে তাহলে তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে।
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-21/news/4211
| < Prev |
|---|























