চিকিত্সকসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না করে শুধু শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করায় বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পুরোপুরি ভবনসর্বস্ব হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। সম্প্রসারিত ওই ভবনের প্রতিটিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত তিনটি অপারেশন থিয়েটার (জেনারেল একটি, গাইনি একটি ও ক্যাজুয়াল একটি) এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের অভাবে সেগুলো কোনো কাজে আসছে না। এগুলো একদিনের জন্যও খোলা হয়নি।
জানা গেছে, গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এ উপজেলার ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প নেওয়া হয়। নতুন করে ১৯টি শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তিনটি অপারেশন থিয়েটার, চিকিত্সকদের কার্যালয় ও আবাসন ভবন নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। চিকিত্সা সরঞ্জামাদি ক্রয়ে আরও অর্ধ কোটি টাকা ব্যয় ধরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে খরচ পড়েছে প্রায় চার কোটি টাকা।
জানা গেছে, ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সকের পদ ছিল নয়টি আর ৫০ শয্যার জন্য আরও ১১ জন বাড়িয়ে ২০ জন করা হয়। একইভাবে আগের সেবিকার স্থলে আরও পাঁচটি বাড়িয়ে ১৫ জন নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাহিদার অর্ধেকও জনবল নেই। ২০ জন চিকিত্সক থাকার কথা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ গাইনি, শিশু, চক্ষু, সার্জারি, নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পদসহ ১৭টি পদই খালি। এর মধ্যে আবার উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বেশির ভাগ সময়ই প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। এ অবস্থায় মূলত দুজন চিকিত্সকের ওপরেই নির্ভর করে এ উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা। আর ১৫ জন সেবিকার স্থলে মোটে পাঁচজন সেবিকা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র বলেছে, ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো করেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। জনবলের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কমপ্লেক্সটি ভবনসর্বস্ব হয়ে পড়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চিকিত্সক স্বল্পতার কারণে অনেকটা সেরকমই মনে হচ্ছে।’
এ ব্যাপারে স্থানীয় দিনমজুর মোবারক আলী (৫০) বলেন, ‘হামাকেরে এলাকাত এত্ত বড় দালান দেখ্যা পরানডা ভর্যা গ্যাচে। মুনি করিছিনো কুনো অসুক হলে হামাকোরক আর শহরোত যাওয়া লাগবি ন্যা। হামাকেরে বাড়ির কাছোত বড় ডাকতোর থাকপি। কিন্তুক একন দেকি হাসপাতাল আচে, ডাকতোর নাই। অসুক হলে হামাকোরক ওগু লিয়া আগের মতোনই শহরোত চল্যা যাওয়া লাগে। কনতো, এত্ত বড় হাসপাতাল কর্যা হামাকেরে পাবলিকের কী উপকার হচে?’
হাসপাতালে আসা রোগী সিহালী হাট গ্রামের মনোয়ারা বেগম (৩৮) বলেন, ‘এখানে এসে শুনেছি ডাক্তার নেই। তাই কোনো ক্লিনিকে গিয়ে চিকিত্সা নেওয়ার কথা ভাবছি।’ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সক আবু সালেহ দীন মুহম্মদ বলেন, চিকিত্সক ও সেবিকাসংকটের কারণে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে শুধু চিকিত্সা দেওয়াটাই দুষ্কর, সেখানে প্রতিবন্ধীদের সার্টিফিকেট দেওয়া, বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র সত্যায়িত করতে গিয়ে আরও সমস্যায় পড়তে হয়।
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা খাজা আব্দুল গফুর বলেন, চিকিত্সকসংকটের বিষয়ে প্রতি মাসেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিত্সক ও সেবিকা না থাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।উপজেলা স্বাস্থ্য কমিটির উপদেষ্টা উপজেলা চেয়ারম্যান মীর শাহে আলম বলেন, এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে চিকিত্সকসংকট রয়েছে। ব্যবস্থাপনাও ছিল অগোছালো। তবে চিকিত্সক বৃদ্ধি করার জন্য চেষ্টা চলছে। আর ব্যবস্থপনা আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো।
বগুড়ার সিভিল সার্জন আব্দুল হক বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিত্সকের পদ আশা করা যায় তিন-চার মাসের মধ্যে পূরণ হবে। তখন আর জনগণকে এত ভোগান্তি পোহাতে হবে না। এলাকার সাংসদ এ কে এম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘চিকিত্সকসংকটের কারণে এলাকার মানুষকে বিশেষ করে সাধারণ মানুষকে চিকিত্সাসেবা নিয়ে চরম কষ্ট করতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমি জরুরি ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।’
Ref. URL: http://prothom-alo.com/detail/date/2009-11-22/news/20905
| < Prev |
|---|























